গতরাতের ঘোরটা এখনও আমার শরীর থেকে সরেনি। চিলেকোঠার ওই মাদুরের ওপর, ধূপ আর গাঁদা ফুলের গন্ধ মাখা অন্ধকারে, স্নিগ্ধা বৌদি আর অনিন্দিতা মাসি — দুজনেই আমার হয়ে গিয়েছিল, আর আমিও তাদের। ভোরবেলা যখন তিনজন ক্লান্ত শরীরে আলাদা আলাদা সিঁড়ি বেয়ে যে যার ঘরে ফিরে গিয়েছিলাম, তখনও বুকের মধ্যে একটা কথাই ঘুরছিল — এটা তো একটা রাতের ব্যাপার না, এটা যেন এখন আমাদের তিনজনের একটা গোপন জগৎ হয়ে গেছে। অনিন্দিতা মাসি হাসতে হাসতে বলেছিল, "সাবধান রে, বিয়ের দিন সবচেয়ে বেশি চোখ থাকবে। ওই রাতেই সবচেয়ে বেশি সাহস লাগবে।" তখন কথাটা রসিকতা মনে হয়েছিল। আজ সকালে বুঝলাম, ও ঠাট্টা করেনি।
কারণ আজ বিয়ের দিন। আর রায়বাড়ি আজ একটা জ্যান্ত মেলা।
সকাল থেকেই বাড়িটা যেন ফুটছে। উঠোনে লাল-হলুদ প্যান্ডেল, শঙ্খ-উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্যি থেকে থেকে বেজে উঠছে, কাকাতো-মাসতুতো বাচ্চাগুলো দৌড়ে বেড়াচ্ছে নতুন জামা পরে, আর মহিলারা শাড়ির আঁচল সামলাতে সামলাতে একে অপরের গয়না দেখে হিংসে করছে। রান্নাঘরের দিক থেকে ধোঁয়া আর গরম তেলের গন্ধ ভেসে আসছিল, বাবুর্চিরা চেঁচিয়ে হুকুম দিচ্ছিল একে অপরকে, স্টিলের বড় বড় হাঁড়ি নাড়ার শব্দ ঢাকের বাদ্যির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। বৈঠকখানায় বরকনের আসন ঘিরে ভিড় জমে গেছে এত ঘন যে নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা নেই। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, পুরোহিতের মন্ত্র, কারো না কারো চিৎকার করে ডাকাডাকি — সব মিলিয়ে এমন একটা হইচই যে কেউ কারো দিকে ভালো করে তাকানোরও সময় পাচ্ছে না। এত লোকের মধ্যে, এত চোখের মধ্যে, তিনটে মানুষের চাপা ইশারা কারো নজরে পড়ার কথাই না — অথচ ঠিক এই কারণেই বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ কাজ করছিল আমার। এত ভিড়, এত লোক, আর তার মাঝেও একটা গোপন সুতো বেয়ে চলা — এই খেলাটাই যেন নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল। অথচ আমার চোখ শুধু দুজনকেই খুঁজছিল।
উপহার রাখার টেবিল সামলানোর নাম করে এদিক-ওদিক ঘুরছিলাম, কিন্তু মন পড়ে ছিল ওই দুজনের দিকে। স্নিগ্ধা বৌদি আর অনিন্দিতা মাসি পাশাপাশি বসে অতিথি সামলাচ্ছিল, একজন আরেকজনকে পান এগিয়ে দিচ্ছে, একজন আরেকজনের কানে ফিসফিস করে হাসছে — বাইরে থেকে দেখলে নিছক বান্ধবীর খুনসুটি। বৌদি আজ লাল-সোনালি শাড়িতে সেজেছেন, খোঁপায় গাঁদা-রজনীগন্ধার মালা, কপালে বড় লাল টিপ — বিয়েবাড়ির উপলক্ষ্যে যতটা জমকালো হওয়া দরকার ততটাই, অথচ সেই শাড়ির আঁচলের ভাঁজেই যেন লুকিয়ে আছে গতরাতের গোপন উত্তাপ। অনিন্দিতা মাসিও আজ একটু বেশিই সেজেছেন, গাঢ় কাজল, ঠোঁটে লাল রং, যেন ইচ্ছে করেই নিজেকে আরও দৃষ্টি আকর্ষক করে তুলেছেন। কিন্তু আমি জানতাম, ওই ফিসফিসের নিচে অন্য কিছু লুকানো। একবার বৌদির হাত অনিন্দিতা মাসির হাতের ওপর পড়ল, এক সেকেন্ডের বেশি না, কিন্তু সেই ছোঁয়ায় গতরাতের প্রতিটা মুহূর্ত যেন ফিরে এল। আমি দূর থেকে দেখলাম, বুকের ভেতর কিছু একটা মোচড় দিয়ে উঠল।
ভিড়ের ফাঁকে হঠাৎ একবার তিনজনের চোখ এক হয়ে গেল। কেউ কিছু বলল না, বলার দরকারও পড়ল না। স্নিগ্ধা বৌদির চোখে একটা প্রশ্ন, অনিন্দিতা মাসির ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দুষ্টু হাসি, আর আমার নিজের বুকের ধুকপুকানি — সবটা মিলিয়ে একটা নিঃশব্দ সিদ্ধান্ত হয়ে গেল তিনজনের মধ্যে। আজ রাতেই। যেভাবেই হোক, একটু সময়, একটু ফাঁক বের করতেই হবে।
দাদা মানে দেবাশীষদা ব্যস্ত ছিলেন অতিথি সামলাতে, ফোনে ক্যাটারারের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঘেমে উঠেছিলেন, মাঝেমধ্যে চশমাটা খুলে চোখ মুছছিলেন। তার নজর বৌদির দিকে একবারও গেল না। এই দৃশ্যটা আমাকে একসঙ্গে স্বস্তি আর অস্বস্তি দুটোই দিল — স্বস্তি কারণ দাদা কিছু টের পাচ্ছেন না, অস্বস্তি কারণ এই লোকটার স্ত্রীকে নিয়েই তো আমি... মনে মনে মাথা ঝাঁকিয়ে চিন্তাটা তাড়ালাম। এখন এসব ভাবার সময় না।
আমি একটা ফন্দি আঁটলাম। বিয়ের উপহারগুলো একটা ঘরে জমা হচ্ছিল, দোতলার শেষ মাথায়, যেটা আগে কখনো কাজে লাগেনি। বললাম, "আমি একটু উপহারগুলো গুছিয়ে রাখি, নইলে হারিয়ে-টারিয়ে যাবে।" কেউ আপত্তি করল না, সবাই এত ব্যস্ত যে আমার সরে পড়াটা কারো চোখেই পড়ল না। মনে মনে ভাবলাম, এটাই সুযোগ।
দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বুক ঢিপঢিপ করছিল। নিচের হইচই যত দূরে সরছিল, ততই একটা অন্যরকম নীরবতা ঘিরে ধরছিল আমাকে — সেই নীরবতার মধ্যেই যেন একটা প্রতিশ্রুতি লুকিয়ে ছিল। ঘরে ঢুকে দেখি সত্যিই এলোমেলো উপহারের স্তূপ — শাড়ির বাক্স, রুপোর বাসনের প্যাকেট, খাম, ফুলের তোড়া, একপাশে স্তূপ করা স্টিলের বাসনের বাক্স। জানালা দিয়ে হালকা আলো এসে পড়ছিল ঘরে, বাইরে থেকে ঢাকের শব্দ চাপা হয়ে ভেসে আসছিল, যেন অন্য একটা জগৎ। গোছানোর ভান করে দাঁড়িয়ে রইলাম, কান খাড়া করে সিঁড়ির দিকে, প্রতিটা পায়ের শব্দে বুক কেঁপে উঠছিল — এই বুঝি কেউ এল, নাকি ওরা?
মিনিট পাঁচেক পর দরজায় ছায়া পড়ল। স্নিগ্ধা বৌদি, শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে, "অতিথির জন্য একটা জিনিস আনতে এসেছি" বলে ভেতরে ঢুকলেন, তারপর নিঃশব্দে দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন। আরেকটু পরে অনিন্দিতা মাসি এলেন, মুখে সেই চেনা রসিকতার হাসি, "তোকে খুঁজতে এসেছি রে" — বলেই দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লেন।
তিনজন এবার সত্যিই একা।
কিন্তু ঘরটা দেখেই বুকটা একটু কেঁপে উঠল। দরজার ছিটকিনিটা আধভাঙা — জোরে ধাক্কা দিলেই খুলে যাবে। আমি একবার হাত দিয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম, নড়বড়ে, প্রায় ঝুলে থাকা মতন। এই বাড়ির অন্য কোনো ঘরের মতো নিরাপদ না এই ঘর, চিলেকোঠার মতো নির্জনও না, বরং একেবারে বাড়ির প্রাণকেন্দ্রের কাছাকাছি — সিঁড়ির ঠিক ওপরে, অতিথিদের আসা-যাওয়ার পথেই। বাইরে তখনও বাজনা বাজছে, নিচ থেকে হইচই ভেসে আসছে, সিঁড়িতে থেকে থেকে পায়ের শব্দ। যে কোনো মুহূর্তে কেউ এসে পড়তে পারে। তিনজনেই সেটা বুঝলাম, চোখে চোখে একে অপরকে সাবধান করলাম, কিন্তু কেউ থামলাম না। বরং এই বিপদটাই যেন শরীরের ভেতর একটা অন্যরকম আগুন জ্বালিয়ে দিল — জানি না কেন, ধরা পড়ার এই সম্ভাবনাটাই যেন প্রতিটা স্পর্শকে আরও তীব্র করে তুলছিল।
অনিন্দিতা মাসি ফিসফিসিয়ে হাসলেন, "ভয়ও লাগছে, আবার থামতেও ইচ্ছে করছে না, বল?" স্নিগ্ধা বৌদি কিছু বললেন না, শুধু আমার হাতটা টেনে নিজের কোমরে রাখলেন। সেই স্পর্শে যেন সব দ্বিধা মুছে গেল। অনিন্দিতা মাসি পেছন থেকে বৌদির কাঁধে ঠোঁট ছোঁয়ালেন, আর আমি দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বুঝলাম, ফেরার আর কোনো পথ নেই।
আমি প্রথমে স্নিগ্ধা বৌদির ঠোঁটে চুমু খেলাম — নরম, চেনা, তবু প্রতিবারের মতোই নতুন। তারপর ফিরে অনিন্দিতা মাসির মুখটাও ছুঁয়ে দেখলাম, তার ঠোঁটেও চুমু বসালাম। অদ্ভুত ব্যাপার, দুজনের মধ্যে কোনো হিংসা নেই — শুধু একটা ভাগাভাগির উষ্ণতা, যেন দুজনেই খুশি যে আমি দুজনকেই চাইছি।
আঁচলটা কাঁধ থেকে গড়িয়ে পড়ল বৌদির, আর তার ভারী, প্রাকৃতিক বুক দুটো ব্লাউজের নিচে থেকে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। হুক খুলতেই সেই ৩৮ঝ বুক নিজের ভারেই দুলে উঠল, আমার হাত না চাইতেই সেদিকে চলে গেল। অনিন্দিতা মাসিও নিজের ব্লাউজ আলগা করলেন, তার বুকও উন্মুক্ত হল — দুই নারীর শরীর পাশাপাশি, একজনের গমরঙা ভারী বক্ষ, আরেকজনের ফর্সা, একটু ছোট কিন্তু নাচুনে বুক। আমার চোখ দুজনের মধ্যে ঘুরছিল, দুজনকেই সমান লোভনীয় লাগছিল।
আমার হাত দুই কোমরে ঘুরতে লাগল, শাড়ির কুঁচি আলগা হতে শুরু করল আঙুলের চাপে। তখনই একটা দৃশ্য দেখলাম যা আগে কখনো দেখিনি — স্নিগ্ধা বৌদি হঠাৎ অনিন্দিতা মাসির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট রাখলেন, সরাসরি, গভীরভাবে। দুই বান্ধবী, দুই নারী, একে অপরকে চুমু খাচ্ছে আমার সামনেই — আমি নিঃশ্বাস আটকে দেখলাম, শরীরের মধ্যে যেন আগুন ধরে গেল। এই দৃশ্যটা যতটা অপ্রত্যাশিত ছিল, ততটাই উত্তেজক।
শাড়ি-পেটিকোট একে একে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল, দুজনেরই পাছা আর উরুর গড়ন উন্মুক্ত হয়ে গেল আবছা আলোয় — বৌদির ভরাট, চওড়া পাছা, আর অনিন্দিতা মাসির টানটান, দোলায়মান উরু। আমার নিজের কাপড়ও ততক্ষণে খসে পড়েছে, দুই নারীর হাত আমার শরীর জুড়ে ঘুরছে। তিনজন উপহারের স্তূপের পাশে একসাথে জড়িয়ে পড়লাম, নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল, মিলন এবার পূর্ণ মাত্রায় শুরু হওয়ার মুখে।
প্রথমে স্নিগ্ধা বৌদির সঙ্গে জড়ালাম, আর অনিন্দিতা মাসি পাশে বসে মুগ্ধ চোখে দেখতে দেখতে বৌদির পিঠে হাত বোলাতে লাগলেন। প্রতিটা ধাক্কায় বৌদির ভারী বুক ছন্দে ছন্দে বাউন্স করছিল, সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে আমার নিজের শ্বাস আটকে আসছিল। তারপর পালা বদলে অনিন্দিতা মাসি আমার ওপর উঠে এলেন, বৌদি তার কাঁধে হাত রেখে ফিসফিসিয়ে উৎসাহ দিতে লাগলেন।
তিনজন একসাথে এক ছন্দে জড়িয়ে গেলাম। নিচ থেকে বাজনার আওয়াজ ভেসে আসছিল, সেই শব্দের আড়ালেই আমরা নিজেদের হাঁপানি, চাপা শীৎকার লুকোনোর চেষ্টা করছিলাম, মুখ চেপে ধরে ধরে। ঘরের বাইরে অনুষ্ঠানের কোলাহল, আর ভেতরে আমরা তিনজন — একটা আলাদা জগতে হারিয়ে যাচ্ছিলাম, যেখানে বিয়েবাড়ি নেই, দেবাশীষদা নেই, লোকলজ্জা নেই, শুধু তিনটে শরীর একে অপরকে খুঁজে নিচ্ছে। উত্তেজনার তুঙ্গে স্নিগ্ধা বৌদি হঠাৎ ফিসফিসিয়ে বলে উঠলেন, "আজ খানকি বানিয়ে দে আমায়!" — কথাটা শুনে আমার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল, এই এক-একটা শব্দ যেন সব ভদ্রতার মুখোশ খুলে দিচ্ছিল। অনিন্দিতা মাসি হেসে জবাব দিলেন, "তবে দুজনকেই সামলাতে হবে তোকে!" আমি পালা করে দুজনের মধ্যে হারিয়ে গেলাম, নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান পুরুষ মনে হচ্ছিল।
শ্বাসের গতি বেড়ে গেল, ছন্দ দ্রুততর হল, সময়ের কথা তিনজনেরই মাথা থেকে মুছে গেল। প্রায় একসাথে তিনজন চরম মুহূর্তে পৌঁছালাম, চাপা শীৎকারে ঘরটা ভরে উঠল। তারপর ক্লান্ত, তৃপ্ত শরীরগুলো একে অপরের গায়ে এলিয়ে পড়ল। নিচ থেকে বাজনা তখনও বাজছিল, কিন্তু আমরা যেন সময়টাকেই ভুলে গিয়েছিলাম।
ঠিক তখনই — যখন সতর্কতা সবচেয়ে শিথিল, যখন শরীর তিনটে এখনও একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে, শাড়ি-ব্লাউজ মেঝেতে ছড়ানো — দরজায় হঠাৎ জোরে টোকা পড়ল।
আমার বুকটা এক লাফে গলার কাছে চলে এল। হাতলটা নড়ে উঠল, কেউ বাইরে থেকে খুলতে চেষ্টা করছে। আর তারপর সেই কণ্ঠস্বর — দেবাশীষদার গলা, একেবারে কাছেই, "এই ঘরেই তো উপহার রাখা, দেখি তো..."
তিনজনের নিঃশ্বাস এক মুহূর্তে বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড আগে যে শরীরগুলো একে অপরের মধ্যে গলে মিশে ছিল, তারাই এখন হুড়োহুড়ি করে আলাদা হয়ে গেল, চোখে আতঙ্ক, মুখে রক্ত সরে গেছে যেন। কেউ কোনো কথা না বলে ঝড়ের বেগে কাপড় খুঁজতে লাগলাম, নিঃশব্দে শাড়ি-ব্লাউজ গায়ে জড়িয়ে নিলাম, চুল ঠিক করলাম কাঁপা হাতে, মনে মনে ভগবানের নাম জপছিলাম। অনিন্দিতা মাসির মাথা ঠিক এই মুহূর্তেই সবচেয়ে বেশি কাজ করল — গলা উঁচিয়ে ভেতর থেকে সাড়া দিলেন, স্বরটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে, "এই তো, উপহার গুছিয়ে রাখছি, একটু সময় লাগবে দাদা!"
বাইরে এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর আবার হাতলে চাপ। ছিটকিনিটা — সেই আধভাঙা ছিটকিনি, যেটা দেখে আমরা প্রথমেই শঙ্কিত হয়েছিলাম — কাঁপতে লাগল দরজার চাপে। আমার মনে হল বুকের ভেতরটা এক্ষুনি ফেটে যাবে। স্নিগ্ধা বৌদির চোখে আমি স্পষ্ট আতঙ্ক দেখলাম, অনিন্দিতা মাসিও ঠোঁট কামড়ে ধরেছেন। কেউ একটা কথাও বলছি না, শুধু তিনজনের চোখ একে অপরকে আঁকড়ে ধরে আছে, যেন চোখেই বলছি — এই বুঝি সব শেষ।
আর ঠিক তখনই, দূর থেকে কারো গলা ভেসে এল — "দেবাশীষদা, ও দেবাশীষদা, এদিকে একটু আসুন তো, পুরোহিতমশাই ডাকছেন!" হাতলের চাপ থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধতা। তারপর পায়ের শব্দ, ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে, সিঁড়ির দিকে।
তিনজন একসাথে যেন বহুদিন পর প্রথম নিঃশ্বাস ফেললাম। স্বস্তির সেই নিঃশ্বাসে চোখে জল এসে গেল আমার। হাত-পা তখনও কাঁপছিল, বুকের ভেতরে ধুকপুকানি থামছিলই না। অনিন্দিতা মাসি নিঃশব্দে হেসে ফেললেন, কিন্তু সে হাসিতে ভয়ের রেশ স্পষ্ট। স্নিগ্ধা বৌদি আমার হাত চেপে ধরলেন, শক্ত করে, যেন এই মুহূর্তে আমরা তিনজন সত্যিই একটা সুতোয় বাঁধা। কেউ কিছু বলার দরকার বোধ করলাম না — চোখেই সব কথা হয়ে গেল। এই মুহূর্তটা, এই একসাথে বিপদ সামলে ওঠার অভিজ্ঞতাটা, যেন গতরাতের মিলনের চেয়েও বেশি কিছু জোড়া দিয়ে দিল তিনজনের মধ্যে।
কিছুক্ষণ পর, নিশ্চিত হয়ে, একে একে সাবধানে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলাম — আগে অনিন্দিতা মাসি, তারপর আমি, শেষে স্নিগ্ধা বৌদি। করিডোর ফাঁকা, নিচ থেকে তখনও বাজনা ভেসে আসছে। কিন্তু বেরোনোর মুখে স্নিগ্ধা বৌদি হঠাৎ থমকে গেলেন। দূরে, সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে দেবাশীষদা তখন পুরোহিতের সঙ্গে কথা বলতে বলতে একবার এদিকে ফিরে তাকিয়েছিলেন। চোখাচোখি হল এক মুহূর্তের জন্য। কিছু বললেন না, কোনো প্রশ্নও করলেন না — কিন্তু তার চোখে একটা অস্পষ্ট খটকা, একটা প্রশ্নচিহ্ন যেন লেগেই রইল।
বৌদি পরে আমাকে আস্তে বললেন, "উনি কিছু বোঝেননি, কিন্তু চোখটা... জানি না কেন, ভালো লাগল না।" আমি কিছু বলতে পারলাম না। এতক্ষণের সেই দুঃসাহসী নেশাটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল, বদলে বুকের মধ্যে একটা অচেনা ভার এসে বসল। শুধু বুঝলাম, আজ রাতের ঝুঁকিটা আমরা কোনোমতে এড়িয়ে গেছি ঠিকই, কিন্তু একটা বীজ যেন বোনা হয়ে গেল কোথাও, যেটা হয়তো সহজে মুছবে না।
নিচে তখনও বাজনা বাজছে, লোকজন হাসছে, বিয়ে সমাপনের শাঁখ বাজছে। কিন্তু আমরা তিনজন যে যার জায়গায় ফিরে গেলাম নিঃশব্দে, বুকের মধ্যে ভয় আর উত্তেজনার একটা অদ্ভুত মিশেল নিয়ে। বৌভাতের রাত এখনও বাকি। আর দেবাশীষদার ওই চাহনিটা আমার মাথা থেকে কিছুতেই সরছিল না।