রাত নটা বেজে কুড়ি মিনিট। বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু ছাদের ট্যাংকে টুপ-টাপ — যেন কেউ একটা একটা করে পয়সা ফেলছে। নিচতলায় মিসেস হকের ব্যাটারির ছোট রেডিও, গেটের বাইরে ফজলু মিয়ার কাশি — দেখার লোক নেই।
ল্যাপটপ বন্ধ করছিলাম। অফিসের একটা ইনসিডেন্ট শেষ লাইনে এসে ঠেকল, তারপর ঘরটা অন্ধকার। মোম পাওয়া গেল না — পরে। বিলটা আমাদের, কাজেই সুইচবোর্ডটা অন্তত নিজের চোখে দেখে আসা উচিত।
সিঁড়ির জরুরি বাতিটা সবুজাভ। সুইচবোর্ডের পাশে এক জোড়া চটি। আমাদের দরজা ডান দিকে, বাঁ দিকেরটা বৌদিদের; মাঝখানে মোটে এই পাঁচ ফুট, আর এটাই আমাদের পুরো মহল্লা। আজ বাঁ দিকের দরজাটা খোলা।
শারমিন বৌদি হাতে মোম নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, দুই হাত দূরে। শিখাটা কাঁপছিল, কপালের আঁচিলটা সবুজ আলোয় কালো। বছর দুই মানে প্রতিবার এক মুহূর্ত — তার যোগফল এই রাত।
“সাজু ভাই, আপনার ওখানেও গেছে?”
“গেছে।” গলা খাঁকারি দিলাম, দরকার ছিল না, তবু। “লাইনটা নেমে গেছে। আগে আপনার দিকে?”
“আগে আমার।” সে এক পা এগিয়ে আসে। “মোম জ্বালাতে গিয়ে আরেকবার হাতড়াতে হয়েছে।”
বৌদি সুইচবোর্ডের সামনে ঝুঁকল — ডান হাতে চাবির হ্যান্ডেল টান দিল, বাঁ হাতটা কোমরে; ঝোঁকটা এত সোজা হওয়ার দরকার ছিল না। আঁচলটা কাঁধ থেকে চুপ করে নেমে গেল।
আমি চোখ নামাইনি। স্বীকার করে বলছি — নামাইনি। আঁচল পিঠে গড়াল, ব্লাউজের ফালাটা সরতে সরতে পিঠের ফাঁক দেখা গেল: কাঁধের হাড়, মেরুদণ্ডের ছায়া, আর ব্রার স্ট্র্যাপের চাপ ছাড়িয়ে চামড়ায় বসে যাওয়া গভীর দাগ।
“চোখটা এদিকে দেবেন, সাজু ভাই,” সে বলল, হাসি রাখা গলায়। “লাইনটা নামে কি না দেখছেন, নাকি?”
আর ঠিক সেই ধাক্কাতেই পা পিছলে গেল — খালি পা, পিচ্ছিল প্লাস্টার; চটিটা ছিল বৌদির। হাতটা দেয়ালে পড়ল, তালু ঠান্ডা প্লাস্টারে। আর পিছনে একটা গোটা শরীর — পিঠের মাঝখানে বুকের ভারী ওজন লেগে থাকল পুরো দুই সেকেন্ড — আর একটা হাত কোমরের পাশে।
“এই দেয়ালটাই খারাপ,” আমি বললাম, গলাটা নিজের কাছেই শুকনো লাগল, “না হাতটা?”
সে হাসল — হাসিটা কানে শোনার, কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছানোর। “দেয়ালটা,” বলল, আঙুলগুলো কোমরের কাপড়ে একটা ছোট কুঁচক বসিয়ে রেখে, “বারো বছর ধরে একই আছে। হাত বদলায়।”
ঠাট্টা করতে গিয়ে — “অন্ধকারে আপনার চোখগুলো এত বড় হয়ে যায় কেন, ওটা কোন রোগ” — আঁচলের কোণাটা ব্লাউজের হুকের ওপর দিয়ে টান খেল। পটাপট।
একটা নয়, দুইটা — পরপর। সামনের ফালাটা খুলে গেল; আঁচলের লেজ আর সাদা ব্রাটা তখনো আটকেছিল। সারা দিন কত লাইন কোড দেখেছি — কিন্তু এই এক সেকেন্ড আমার ভেতরে পাকা হয়ে বসে গেল: দুই কাপের মাঝখানের ফাঁক, আর কাপড়ের শক্ত হয়ে দাঁড়ানো ঢালটা।
বৌদি একটুও তাড়াহুড়ো করল না। মোম এক হাতে ধরে অন্য হাতে হুকগুলো এক এক করে টিপে দিল — ছুতারের হাতের মতো ঠান্ডা হিসাবে। এক অন্ধকার ল্যান্ডিংয়ে কেউ একা আঁচল টানতে চায় না, যদি না তার দেখানোর মতো কেউ থাকে।
আর ঠিক তখনই ডান দিকের দরজাটা খুলে গেল। রূপা বেরিয়ে এল, আঁচল কাঁধে, দুই হাত কোমরে। একবার আমার দিকে তাকাল, একবার বৌদির দিকে — ঠিক দুইবার, তৃতীয়বার নয়। খোলা ফালার দিকে নয় — বৌদির চোখে, তারপর আমার চোখে।
“বৌদি,” সে বলল, একেবারে সাধারণ গলায়, যেন সকালের চায়ের হিসাব চাইছে, “ওনার চোখটা বেশি লোভী না?”
“তোরটাও কম না, রূপা।” বৌদি আঁচলটা কাঁধে তুলে ধীরে ধীরে হাসল।
“আমারটার হিসাব আমি রাখি,” রূপা বলল।
হাতটা আমার কোমরের পাশে গিয়ে বসল, আঙুল শক্ত আর ঠান্ডা — মিনিটখানেক সে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা ফ্রেমে হাত রেখে ছিল। “ভেতরে এসো,” সে বলল।
ভেতরে ঢুকলাম। বৌদি নিজের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, হাত কোমরে, মোমটা নিচে নামানো। কেউ দরজা বন্ধ করল না; দুই দরজার মাঝখানে ওই পাঁচ ফুট, কেবল সবুজ একটা ফাঁক।
দুইটা জিনিস মাথায় ঢুকল। এক: লোডশেডিং আটটা থেকে দশটা — সকালে শিডিউলের কাগজটা দেখেই রূপা সন্ধ্যায় বলেছিল; মানে কেউ আগেই জানতে পারত কে কখন ল্যান্ডিংয়ে থাকবে। দুই: রূপা বেরিয়েছিল চুল আঁচড়ানো, আঁচল আঁট করা অবস্থায়। অন্ধকারে কেউ আঁচড়াতে বসে না। যে বসে থাকে, সে অপেক্ষা করে।
ওই দুই বছরে যে-ই আগে হাতটা বাড়িয়েছে, আজ রাতে সেটা আমার কোমরে এসে বসেছে — আর যে দরজায় হাতটা বাড়ল না, সেই দরজা আধা খোলা রাখার হিসাবটা কারোর ছিলই।
রূপা দরজা বন্ধ করল না, শুধু আধা এঁটে রাখল। ঘড়িতে সাড়ে নয়টা।
রাত নটা পঁয়তাল্লিশ। ছাদের ট্যাংকে টুপ, টুপ — কেউ যেন এখনো গুনছে। ড্রেসিং টেবিলে একটাই মোম, সিলিং ফ্যান বন্ধ, আর জানালাটা খোলা — তার মুখ ল্যান্ডিংয়ের দিকে।
রূপা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল — ঘরের শাড়ি, আঁচল কাঁধে আঁট, চুল আঁচড়ানো, ডান হাতে বিয়ের বালা। তারপর মুখ তুলল। দুই বছর ধরে চোখ আসলে সরে যেত — দেয়ালে, মেঝেতে, সুইচবোর্ডের ধুলোর রেখায়। আজ সরে গেল না।
“মতিঝিলে আজ অডিট টিম এসেছিল,” সে বলল। “সবাই পরের কাগজ চায়, নিজের ফাইল কেউ ছাড়ে না। শেষে সব জমা আমার ডেস্কে।”
“হুম” বলতে যাওয়ার আগেই তার হাত দুটো পিছনে গেল।
পটাপট। পটাপট। পটাপট।
একটা নয়, তিনটা — প্রথমটা চট করে, শেষটা যেন এতক্ষণ ওটারই অপেক্ষা ছিল। গলার তাল বদলাল না।
সারা দিন মাথায় যত লাইন কোড, যত ডিপ্লয়, যত ফেল করা বিল্ড — সব এক সেকেন্ডে সাইলেন্ট। যে আঁচল দুই বছরে একবারও দেখা যায়নি, সে এখন পাঁচ হাত দূরে ব্লাউজ কোমরে ঝুলিয়ে রেখেছে — দেখানোর দরকারে।
“এসো,” সে বলল, পিছন না ফিরেই।
সে ঘুরে দাঁড়াল। খোলা ব্লাউজ, ভেতরে সাদা ব্রার দুই ফালা, আর মোমের আলোয় দুই কাপের শক্ত হয়ে দাঁড়ানো ঢাল। ভারী বুক নিজের ওজনেই নিচে টানা — এজন্যই সন্ধ্যায় কাঁধে ব্যথা করে।
“বলো তো,” সে বলল, চিবুকটা হাতে ঠেকিয়ে, “কী দেখেছ?”
“আঙুল।”
“মানে?”
“তোর আঙুল। লম্বা।”
উত্তেজনায় আমার বাক্য ছোট হয়ে যায়, সেটা সে জানে। সে আমার হাত ধরে নিজের কোমরে বসিয়ে দিল — হাতটা ঠান্ডা। দুজনে হাসলাম; তারপর হাসিটা মোমের শিখার মতো নিভে গেল।
সে গ্লাসে দুই চুমুক পানি খেল। “খাটটা এখনো ক্যাঁচ করে,” বলল। “বিয়ের আগের খাট। তেল লাগাবে না?”
সে জানালার পাশে গেল, আর পিছনে হাঁটতে গিয়ে শাড়িটা খুলে পড়ল। জানালার কাচে দুই তালু, বুকটা কাচে, তারপর একবার পিছনে তাকাল। হাত ঢুকিয়ে ব্রার হুক খুলতে গিয়ে জায়গাটা না পেয়ে দুইবার হাতড়াল। “ধরো,” বলল।
আগে চুলের মতো একটা ফাঁক, তারপর গোটা মাঠ। ব্রাটা সরে গেল, নিচের ফালাটা কাচের গায়ে চ্যাপ্টা হয়ে বসে গেল, আর আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম — আঁচলটা কাঁধ থেকে খসে বুকের ওপর ঝুলে রইল।
মুখ বাড়ালাম। চুক, চুক। চুক চুক। তার এক হাত আমার চুলে, অন্য হাত কাচে; আঁচলের নিচ দিয়ে গরম স্বাদটা জিভে, তেতো-মিষ্টি। আমি সেই ভারী ওজনটা টেনে ধরে রাখলাম — দুই বছরে জমানো জিনিসটা কতটা ভারী।
“খিদে পেয়েছে?” সে বলল, আমার চুলে টান দিয়ে। মাথা তুললাম না। তারপর চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলল — একবার। আমি দাঁড়ালাম। সে আমার শার্টটা এক টানে খুলে ফেলল, তারপর নিজের ব্লাউজটা খুলে ডেস্কের ওপর ফেলে দিল।
ঘরের কোণে পুরনো কম্পিউটার ডেস্ক, এক কোণে ল্যাপটপটা বন্ধ। সে ডেস্কের কিনারায় পিছন দিয়ে হেলান দিয়ে বসল। সায়া আর প্যান্টিটা নামাতে একটা হাতই লাগল।
“জানালা খোলা রাখবি,” সে বলল। বাক্যের শেষে নয়, বাক্যের আগে।
তার দুই উরু ধরে কাঁধে তুলে নিলাম — ভারী উরু, ভেতরের দিকটা গরম, গোড়ালি আমার পিঠের পিছনে এসে ঠেকে গেল। ডান পায়ের গোড়ালি খাটের পায়ায় ঠেকিয়ে ভার নিলাম — তখনই সেটা শব্দ করল।
ক্যাঁচ। আর তারপর প্রথম ধাক্কায়। ক্যাঁচ-ক্যাঁচ। ক্যাঁচ-ক্যাঁচ।
আমার গোড়ালিটা ঠিক ওই আলগা জোড়টার ওপরেই — প্রতিটা ধাক্কায় খাটটা কথা বলে দিচ্ছে। রূপা আমার কাঁধে দুই হাত রেখে মাথা পিছনে ফেলল।
“আ-আ-আহ,” সে বলল। জোরে। তার গলা এই ঘরে এত জোরে উঠতে পারে, সেটা আমি জানতাম না। সে একবার জানালার দিকে তাকাল — ছোট, হিসাবি একটা তাকানো — তারপর আরও জোরে। “উহ্… সাজু… আ-আ-আহ।”
মাথায় প্রশ্নটা এল: এই চিৎকারটা কি সত্যিই এত জোরে হওয়ার দরকার? নাকি দরকারটাই আজকের পরিকল্পনা? প্রশ্নটা আসার আগেই উত্তরটা বাইরে ছিল — খোলা জানালা দিয়ে, ল্যান্ডিংয়ের সবুজ আলোয়, ওই পাঁচ ফুট পার হয়ে।
রূপা আমার গলাটা জড়িয়ে ধরল। “তুই থামিস না,” বলল, ছোট গলায়, “সাজু… সোনা।”
উত্তেজনায় আমি মাত্র দুই শব্দ বলি। তারপর শুধু খাটটা বলল। ক্যাঁচ-ক্যাঁচ-ক্যাঁচ।
চরমে ওর পিঠ সোজা হয়ে গেল, ডান হাতটা পিছনে গিয়ে চেপে বসল দেয়ালে — যে দেয়ালের ওপাশে মঈন ভাইয়ের শোবার ঘর — আর ঠিক তখনই দরজায় বাজল।
টিংটিং। টিংটিং টিং।
আমি থামলাম — একটা প্রোডাকশন সার্ভার যেভাবে মাঝরাতে পড়ে যায়। রূপা হাসল; কাঁধ থেকে নামল, চাদরটা টেনে বুকের সামনে চাপল, মেঝেতেই বসল।
“মোমটা ড্রেসিং টেবিলে,” সে বলল। “প্যান্টটা চেয়ারে। দেখিস।”
ঘণ্টাটা বিদ্যুৎ ছাড়াও বাজে — পিতলের, হাতল টিপে টিংটিং। ফজলু মিয়া ল্যান্ডিং থেকেই গলা দেয়; মানে যে বাজাচ্ছে সে আমাদের দরজার ঠিক সামনে। প্যান্ট তুলে নিলাম, খালি গায়ে শার্ট চাপালাম, দরজা খুললাম।
শারমিন বৌদি আর মঈন ভাই। বৌদি সন্ধ্যার শাড়িটাই পরে, আঁচল কাঁধে ঠিক করা, হাতে মোম নেই, ঠোঁটে শুকনো হিসাবি হাসি। আর মঈন ভাই — সাতচল্লিশ বছরের ভরাট শরীর, হাঁটুতে পুরনো ব্যথা — সিঁড়ি উঠে হাঁপাচ্ছে, ডান হাতে একটা বোতল।
“আজ উঠলাম রে,” সে বলল, দুইবার শ্বাস নিয়ে — একবার, তারপর আরেকবার। “ব্রাঞ্চে কাল ছুটি, তাই ভাবলাম নারায়ণগঞ্জে একা শুয়ে লাভ নেই। আর মদটা তো আনলাম, ভালোটা।”
তারপর চোখ নামিয়ে আমার খালি পায়ে তাকাল, তারপর হো হো করে হাসল। “সাজু,” বলল, “খাটটা তেল দে। ক্যাঁচক্যাঁচে সারা ফ্লোর শুনল। আমি সিঁড়িতেই কান পেতেছিলাম — ভাবলাম, তোদের কোনো একটা অ্যাপ আবার প্রোডাকশনে গেছে।”
বৌদি তার দিকে ফিরল না। আমার দিকে তাকাল — একবার, ঠিক একবার; সেই একবারের মধ্যে কপালের পাশের আঁচিলটা সবুজ আলোয় কালো দেখাল।
“মোম নিভাইও না, সাজু ভাই,” সে ধীরে ধীরে বলল। “এই বাড়িতে মোম পোড়ানো দেখতে ভালো লাগে।”
রূপা ভেতরে চাদরের নিচে থেকে সব শুনল; একবার হাসির শব্দ হলো, তারপর চুপ।
“কাল রাতে আমাদের ওখানে,” মঈন ভাই বলল, বোতলের ঠোঙাটা আমার দিকে একটু বাড়িয়ে। “বৌমা, তুইও। ভাত আছে, মাংস আছে, যা নেই সেটাও আছে। একানে-সেকানে না, এক রাতে।”
বৌদি আঁচলটা কাঁধে তুলল, তারপর দুজনে ফিরল — বাঁ দিকে। মঈন ভাই সিঁড়ির মাথায় গিয়ে আবার ফিরল, আর এবার তার গলায় হাসি ছিল না।
“কাল সাড়ে আটটা, সাজু।”
পাঁচ ফুটে সবুজ আলো জ্বলল কিছুক্ষণ, তারপর বাঁ দিকের দরজাটা বন্ধ হলো। আমাদের দরজায় এক জোড়া চটি, বাঁ দিকের দরজায় আরেক জোড়া — কারোর দরজাতেই চেইন নেই।
বৃহস্পতিবার, রাত সাড়ে আটটা। ল্যান্ডিংয়ে দুই জোড়া চটি। আমার খালি পা আমাদের জোড়ায় ঢুকল; বাঁ পাশেরটা তখনো ঠান্ডা, কারণ বৌদি অনেক ভেতরে। মঈন ভাই জেনারেটরের লাইনটা নিজের ফ্ল্যাটে টেনে নিয়েছে — দুই দরজার মাঝখানে একটা আলো, আর সেই আলোর সুইচ কার হাতে।
ভাত নিতে গিয়ে সে হাত বাড়াল, আর ঠিক সেই সময়ে বৌদি তার পিছনে এসে দাঁড়াল। দুই হাতে রূপার আঁচলের ভাজটা টান দিল — দরকার ছিল না, তবু টান। তারপর ডান হাতটা কাঁধে গিয়ে বসল, আঙুলগুলো কাঁধের হাড়ের ওপর ছড়িয়ে, যেমন সেলাইয়ের আগে কাপড় চাপা হয়।
“বৌমা,” বলল, গলাটা ধীর, “তোর শাড়িটা ভারী।”
ভারী শাড়ি একা কথা নয় — এক নারী আরেকজনের কাঁধে হাত রাখলে যে ভারটা বইতে হয়, সেটা এই দুই বছরে আমি অনেকবার হিসাব করে দেখেছি। রূপার কাঁধটা একটু নেমে গেল, আর সে ঘুরল না; টেবিলের এপার থেকে আমার দিকে তাকাল — ঠিক দুই সেকেন্ড।
নয়টা বাজে। মঈন ভাই দ্বিতীয় পেগটা নামালেন, তারপর নিজের গল্পে ঢুকলেন। “আমার বিয়ের রাতে,” বললেন, দুইবার শ্বাস নিয়ে, “শরুকে দেখতে গোটা ব্রাঞ্চ চলে এসেছিল, সাজু। সারা সেকশন ফাঁকা। আসলে কী এসেছিল, জানিস?”
“জানি না,” বললাম।
“এক জোড়া পেন্ডুলাম,” বললেন, তারপর নিজেই হেসে ফেললেন।
বৌদি হালকা করে তার কাঁধে চড় মারল, হাতের পিঠের দিকটা দিয়ে। “তোর মুখে ও কথা শোভা পায় না,” বলল, গলায় শুকনো শ্লেষ। তারপর হাতটা সরিয়ে নিল না। চারজন হাসলাম; তারপর হাসিটা থেমে গেল, আর ঘরটা থেকে গেল।
মঈন ভাই খালি কাচটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন, তারপর বৌদির দিকেই তাকিয়ে থেকে বললেন, “শরু, আট বছর হয়ে গেল, না?”
বৌদি উত্তর দিল না। সে শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইল, মুখে সেই শুকনো হাসিটা, আর আঙুলের ডগা দিয়ে নিজের গ্লাসের গায়ে ছোট একটা চক্র আঁকতে থাকল। সংখ্যাটা টেবিলের ওপর চারজনের সামনে পড়ে রইল, কেউ সেটা তুলতে হাত বাড়াল না। আমি জানি না ওই আট বছরে কী হয়েছিল, আর সেটা জানার কথা আমারও নয় — কিন্তু এই একটা বাক্যের পর টেবিলটা আর আগের টেবিল থাকল না।
টেবিলের নিচে তখন আমার ডান গোড়ালিতে একটা গোড়ালি এসে লেগে রইল। গোড়ালিটা বৌদির — ওদের চটি দরজার বাইরে, তাই তার পা খালি। সে গোড়ালিটা আমার ডান লেগের গায়ে চেপে ধরে রাখল।
মঈন ভাইয়ের ডান হাতটা তার কাপের পাশ থেকে নেমে গেল, আর সেটা রূপার শাড়ির ভাঁজের ভেতরে ঢুকে বাঁ উরুতে গিয়ে বসল। রূপা গ্লাসটা না নামিয়েই এক চুমুক খেল, চোখটা বৌদির মুখে। শব্দ ছিল ঠিক দুইটা — চুড়ির টুংটাং-টুং, আর শাড়ির খসখস।
তারপর চোখ টেবিলের ডানায় একটা জিনিসে গিয়ে থামল। ভাতের প্লেটের পাশে, পেঁয়াজের আংটির ওপাশে, রূপালি ফয়েলের একটা পাতা — দুই ট্যাবলেটের জায়গায় একটা খালি, কোনো হরফ নেই। ঔষধের পাতা। অর্ধেক খাওয়া। যে টেবিলে চারজন হাত বাড়ায়, সেই টেবিলে দুই ঘণ্টা ধরে পড়ে আছে, আর কেউ দেখেনি।
মঈন ভাইয়ের চোখ আমার চোখে গিয়ে পড়ল। আমি কী দেখছি, সেটা তিনি ধরতে পারলেন — তারপর হেসে বাটিটা টেনে ঠিক ওই পাতাটার ওপর বসিয়ে দিলেন।
“ওটা আমার প্রেসার,” বললেন, গলায় তখনো হাসিটা। “দুইবারে খাই। মাঝে মাঝে মাঝরাতে একবারে খেয়ে ফেলি, ভুলে। ভুলে যাওয়াটাই আসল রোগ, সাজু — বাকিটা শুধু ব্যবসা।”
দশটা বাজে। মঈন ভাই খালি কাচটা টেবিলে রাখলেন, তারপর প্রস্তাবটার হাত-ঠেলা না দিয়ে সোজা বলে ফেললেন।
“একটাই রাত, সাজু। কাল। দুইটা দরজা। তোর-আমার দুই জোড়া চটিও এখানেই। রাতে কারো দরজায় চেইন লাগে না, সেটা তুই জানিস, আমি জানি। কালও লাগবে না। যে চায় দরজা খুলবে, যে চায় ঢুকবে। কেউ কারো পিছনে হাঁটবে না, জিজ্ঞেস করবে না, তাড়া দেবে না। সকালে সবাই নিজের চায়ের কাপ নিয়ে বেরোবে, আর কোনো লাইন ওই পাঁচ ফুট পার হবে না।”
“বাজি?”
“বাজি না,” মঈন ভাই মাথা নাড়লেন। “নিয়ম।”
বৌদি উঠে দাঁড়াল — “বাটিটা ধুয়ে আসি” — আর রান্নাঘরে গেল; দরজাটা বন্ধ করল না, আধা এঁটে রাখল। এক মিনিট পরে ফিরে আগের জায়গায় বসল, আর তার আঁচলটা আর আগের মতো নেই — আগে ডান কাঁধে ছিল, এখন বাঁ কাঁধের দিকে টানা। শাড়ি এক মিনিটে নিজে নিজে সোজা হয় না।
তারপর রূপা উঠে দাঁড়াল। আঁচলটা কাঁধে টান দিল, তারপর দুই হাত টেবিলের কিনারায় বসিয়ে চারজনকেই একবার দেখল — মঈন ভাই, বৌদি, তারপর আমি।
“নিয়মটা তোমার,” বলল, “কিন্তু শর্তটা আমার।”
টেবিলের ওপরে এক সেকেন্ড শব্দ ছিল না।
“শর্তটা একটাই,” রূপা বলল। “যার দরজা সে নিজে খুলবে — পাঠানো কী-এর হিসাব কেউ রাখবে না।”
তারপর হাত বাড়াল, আর বৌদির হাতটা চেপে ধরল — দুই আঙুল দিয়ে; চাবি ঘোরানোর মতো নয়, তালার ভেতরে হাত ঢোকানোর মতো। বৌদি হাতটা সরাল না। সে উঠে রূপার কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল, আর ঘাড়টা ছোট কোণে বাঁকিয়ে ফিসফিস করল — দুই কি তিন শব্দ, আমি ধরতে পারলাম না। পুরো সময় বৌদির চোখ আমার দিকেই ছিল।
এগারোটা বাজে। চারজন একসাথে ল্যান্ডিংয়ে বেরোলাম; পাঁচ ফুট জায়গায় চারজন একসাথে এই প্রথম — কাঁধে কাঁধ লেগে গেল, কেউ কাউকে ফাঁক দিল না। বৌদি নিজের দরজায় পিঠ হেলান দিয়ে দাঁড়াল, আরেক হাতে চাবিটা তালায় না ঢুকিয়ে শুধু ঘোরাতে থাকল।
তারপর সে ভেতরে গেল। মঈন ভাই দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে একবার ফিরে আমার দিকে তাকালেন, তারপর হেসে বললেন, “কাল বারোটার পরে, সাজু। ফজলু মিয়া গেট লাগানোর পর।”
রূপা আমার কোমরের পাশে হাত বসিয়ে টান দিল — আঙুল শক্ত আর ঠান্ডা, কারণ এক মিনিট আগেও সে বাইরের হাওয়ায় দাঁড়িয়ে ছিল।
“শুনছ?” বলল।
“শুনছি,” বললাম।
“কাল তুমি একা যাবে না — যার দরজা সে নিজেই খুলবে।”
শুক্রবারটা অফিস বন্ধ। আমি সারা দিন খালি একটা চাবি-ঘোরানোর শব্দ শুনলাম, যেটা আসলে চাবি ছিল না।
রাত বারোটা চল্লিশ। ফজলু মিয়া সাড়ে বারোটায় গেট লাগিয়ে গেছে; নিচের চায়ের দোকান থেকে কাচের গ্লাস নামানোর শব্দ — টিং, তারপর অনেকক্ষণ চুপ, তারপর আবার টিং। ল্যান্ডিংয়ের দুই দরজা দুইটাই আধা খোলা, সামনে দুই জোড়া চটি, চেইন দুইটাই হাতলের গায়ে — ছোঁয়া হয়নি।
মঈন ভাই বলেছিলেন, “একটাই রাত, সাজু। কাল।” আর বৌদি বলেছিলেন, “সাজু ভাই, আমার দরজাটা রাতে ঠেলা লাগায় না।” দুইটা কথা আলাদা, হিসাব একটাই।
বাঁ দিকের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, আঙুলের ডগা দরজার গায়ে রাখলাম — ঠেলা লাগালাম না, শুধু রাখলাম। দরজাটা নিজেই টিপ খুলে গেল, এক আঙুলের ওজনে, শব্দ না করে। তালা নেই, শুধু একটা তৈরি ফাঁক, যেটা কেউ সন্ধ্যায় নিজের হাতে বসিয়ে রেখেছে।
ভেতরে টেবিল ল্যাম্প কমলা, মোম নয় — আজ লোডশেডিং নেই। জানালা পুরো খোলা, বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। খাটটার ঠিক পিছনেই সেই দেয়াল — ইট, সিমেন্ট, এক হাত মোটা, আর ওপাশে আমার ঘর।
শারমিন বৌদি দেয়ালের গায়ে কাঁধ রেখে দাঁড়িয়ে ছিল। শাড়ি নেই — একটা সাদা ফতুয়া, তার নিচে কিছুই নেই; কাপড়টা নিজের ওজনেই টান খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চুল খোঁপা খুলে নামানো, কপালের আঁচিলটা কমলা আলোয় কালো।
“দাঁড়িয়ে হিসাব করছিস,” বলল, শুকনো একটা হাসি দিয়ে। “তোকে ছোট থেকে দেখছি, সাজু। তুই কোনোদিন হিসাব ভুলিসনি।” সে ফতুয়ার গলা ধরে একবার নাড়ল। “আমার বয়স বেয়াল্লিশ, তোর ছত্রিশ, তোর বৌয়ের একত্রিশ। এই রাতে এই ঘরে গুনতে হবে শুধু একটা — কোন দরজা খোলা হয়েছে। বাকিটা গুনিস না।”
হাত বাড়ালাম। ফতুয়ার কিনারা ধরে টানলাম; ভেজা তুলোর গন্ধ, আর বুকের ওপর এসে টানটা আটকে গেল — ওই ওজনের জন্য আমার হাত তৈরি ছিল না। তারপর কাপড়টা একপাশে সরে গেল, দুইটা একসাথে বেরিয়ে এল, নিজের ওজনেই নিচে নেমে গেল।
বৌদি হাসল, তারপর দুই হাত আমার বুকে রেখে জোরে ঠেলে দিল। “দাঁড়িয়ে থাকবি না,” বলল। “তুই একদম ফালতু।”
পিছনে খাটের কিনারা, বসে পড়লাম। সে আমার সামনে এসে দাঁড়াল, দুই হাত নিজের কোমরে — সন্ধ্যায় ল্যান্ডিংয়ে যেভাবে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক সেভাবেই, শুধু শাড়িটার ব্যাপারটা নেই। তারপর, ঠিক যখন আমার মুখ তার বুকের ওজনের ছায়ায়, দেয়ালের ওপাশে আমার খাটটা শব্দ করল।
ক্যাঁচ। শব্দটা আমি চিনি — সাত বছর ধরে চিনি। ক্যাঁচ, তারপর দুইবার। ক্যাঁচ-ক্যাঁচ। তারপর রূপা হাসল — ঘরের হাসি, যে হাসিটা আমি অনেক দিন শুনিনি।
তারপর তার গলা থেকে একটা টুকরো বেরিয়ে এল, এত পরিষ্কার যে দেয়ালটা বাড়তি: “মঈন ভাই, আপনাকে এত তাড়া কে দিল?”
আমার পেটের ভেতরটা একসাথে দুই দিকে চলে গেল — খারাপ লাগল, আর ভালোও লাগল, একই মুহূর্তে, একই ওজনে। মুখ তার স্তনের ঠিক নিচে, আর আমি মাথা নিচু করে মুখ বাড়িয়ে দিলাম — মানে থামা হলো না।
চুক, চুক। চুক চুক। বোঁটাটা মুখে নিয়ে টান দিতেই বৌদির ঘাড় পিছনে হেলে গেল, আর তার হাত এসে আমার চুলে বসল। তারপর সে নিজে থেকেই সরে গেল, আমার কোলের ওপর পা তুলে, কাঁধে ভর দিয়ে উঠে বসল — নিজের ওজনের পুরোটা এসে পড়ল আমার নিচে। চপচপ।
“উফ্,” সে বলল, তারপর হাসল, শ্বাস ফেলে ফেলে। “আমার বয়সে এইটা সকালের ব্যায়াম না, সাজু।”
তবু সে থামল না। হেডবোর্ড ধরে কোমর দুলিয়ে চলল; প্রতিবার নিচে নামার সময় তার দুই বুক এসে পড়ত আমার মুখের ঠিক পাশে — ওজনটা গালে, চোখে, ঠোঁটে লেগে যেত। থপ। থপ-থপ।
“উফ্ফ্… এই বয়সে…” সে বলল, হাসির মাঝখানে, শ্বাস ফেলে। আমি তার কোমরটা দুই হাতে ধরে সোজা করে ধরলাম, আর সে নিজে থেকেই আরেকবার দুলে উঠল।
তারপর সে নামল, কোল থেকে গড়িয়ে খাটে শুয়ে পড়ল, মুখটা বালিশের দিকে। আমি পিছনে বসলাম, এক হাতে কোমর ধরে টেনে তুললাম — উপুড় করে, পেটের নিচে একটা বালিশ ঠেলে দিয়ে। তারপর ভেতরে গেলাম, আর বৌদি একটা লম্বা শব্দ করল — “ওঃ মা-গো” — যেটা সে চেপে ধরতে পারল না।
দুই হাত তার পাছার দুই দিক ধরে টানছিল, আর ঠিক তখন ওপাশের খাটটাও একই তালে পড়তে শুরু করল। থপ-থপ। থপ-থপ। ক্যাঁচ-ক্যাঁচ। কেউ কাউকে বলে দেয়নি, কেউ কোনোদিন জিজ্ঞেসও করবে না — দুই খাট এক দেয়ালের দুই গা ঘেঁষে বসানো, তবু আজ রাতে দুইটাই একটাই তাল পেয়ে গেছে।
“আরো… আরো জোরে, হারামি…”
আর আমার মাথার ভেতরে ঠিক তখনই একটা শব্দ জেগে উঠল, যেটা আমি জীবনে নিজের গলায় বলিনি। শব্দটা রাগের সাথে এল না — উত্তেজনার সাথে এল; আর আমি চোখ বুজলাম।
তারপর টর্চের আলোটা এল। দরজার ফাঁকে একটা সাদা রেখা — প্রথমে সরু, তারপর চওড়া, তারপর দেয়ালের ওপর দিয়ে গড়িয়ে আমাদের খাটের পাশে এসে থামল। তার সাথে ফিসফিস, দুইটা গলা — একটা পুরুষের, আরেকটা উঁচু, মহিলার। মহিলার গলাটা আমি চিনি: B-1-এর মিসেস হক, সোসাইটির সেক্রেটারি, এই বাড়ির সব খবরের একমাত্র আধার।
“ট্যাংক থেকে পড়ে। তুমি দুঘণ্টা আগে গেট লাগাতে পারতে না?”
ঠিক সেই এক সেকেন্ডে — ওপাশের খাটটা থামল, এই খাটও থামল। দুই দিকের শব্দ, যেন কেউ দুই জায়গায় একসাথে একটা সুইচ নেমে দিল। এই এক সেকেন্ডের নিরবতাটাই আজকের রাতে দুই দিকের একমাত্র আলোচনা। কেউ কথা বলল না, কেউ দরজা বন্ধ করল না।
বৌদির হাত আমার মুখে এসে পড়ল, তারপর আমার চুলে। টর্চের আলোটা খাটের ওপর দিয়ে গড়িয়ে দরজার দিকেই ফিরে গেল, তারপর ঝাড়ুর শব্দ — শুকনো ঝাড়ু সিঁড়ির ধাপে পড়ার শব্দ, ঝপ, ঝপ, ধীরে ধীরে নিচে নামা। তারপর সিঁড়ির দরজাটা ঠেকে বন্ধ, আর ল্যান্ডিংয়ে আবার সবুজ অন্ধকার।
ঝাড়ুর শব্দ নিচতলায় মিলিয়ে যেতেই ওপাশ থেকে শব্দটা ফিরে এল — নরম, ভেজা, হিসাব করে; চপচপ, থপ, ক্যাঁচ। বৌদি খাটের কিনারায় কুঁজো হয়ে দাঁড়াল, আর আমি পিছনে দুই হাতে কোমর ধরে টেনে নিলাম। আমার ডান হাতটা দেয়ালে গিয়ে বসল, কাঁধের সমান উঁচুতে — দুই রাত আগে রূপা ঠিক এই উচ্চতায় হাত ঠেকিয়ে ধরেছিল।
আজ ও-পাশে কে হাত ঠেকাচ্ছে, সেটা আমার জানার কথা না। আর আমার পাশে কে হাত ঠেকাচ্ছে, সেটা তার জানার কথা না। দেয়ালটা দুই দিকেই একই ঠান্ডা। ওপাশ থেকে গলাটা আরেকবার উঁচু হল, তারপর টুকরো টুকরো করে নেমে গেল; তারপর শুধু ফোঁসফোঁস।
“সাজু…” বৌদি ফিসফিস করল, প্রথমবার আমার নামটার পিছনে ওই ভাই শব্দটা বাদ দিয়ে। তারপর পিঠ সোজা হয়ে গেল, কোমরটা শক্ত হয়ে গেল, আর সে দেয়ালের দিকেই মাথা ঠেকিয়ে রেখে দিল। আমি তার পিছনে দুই হাতে কাঁধ ধরে রাখলাম।
তারপর দুইজন খাটের ওপরেই পাশাপাশি শুয়ে পড়লাম। বৌদি ফতুয়াটা তুলে গায়ের ঘাম মুছল, আর আমি তার কপালে একবার ঠোঁট রাখলাম।
“হাসি সকাল নটায় আসবে,” সে বলল, ছাদের দিকে তাকিয়ে। “সে কিছু জিজ্ঞেস করে না, রাখলেও রাখে। শুধু বিছানার চাদর দেখে।” সে একহাত তুলল। “তাই ভোর পাঁচটায় উঠে দুই ঘরের চাদরটা বদলে রাখব। তুই টেনশন নিস না — পাঁচ মিনিটের কাজ।”
আমি হাসলাম। “আর শুকনো জায়গা?”
“শুকনো জায়গা আমার মাথার ব্যাপার,” সে বলল। “নিয়মটা মঈনের, শর্তটা তোর বৌয়ের, আর হিসাবটা আমি রাখব। তুই শুধু ছাদের দরজার হুড়কোটা ভোরে খুলে রাখিস।” তারপর সে চোখ বুজল, শ্বাস ধীর হল, ঠোঁটে তখনো লিপস্টিকের ছাপ।
কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। উঠলাম ভোরের আলোয় — জানালার ফাঁকে প্রথম ধূসর রেখা, বাইরের বৃষ্টি শেষ ফোঁটা ফেলছে। বৌদি তখনো পাশে। এই দেয়ালের ঠিক ওপাশে আমার নিজের খাট, আমার নিজের বালিশ — যেখানে সাত বছর ধরে আমার মাথার ছাপ; আজ রাতে ওটার ওপর অন্য কারো মাথা।
খালি পায়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। কাচে বৃষ্টির ফোঁটা, তারপরের সবুজ — ল্যান্ডিংয়ের বাতিটা এখনো জ্বলছে, আর তার নিচে দুইটা দরজা, দুইটাই আধা খোলা, কারোর ফাঁকে চেইন নেই। বৌদির খাটটাকে আজ রাতে আমি আমার খাট বলেই ধরে নিয়েছি।
শেষে আমার বিছানায় শারমিন, আর দেয়ালের ওপাশে আমার নিজের বিছানায় রূপা তখনো ফোঁসফোঁস করছিল। কারো দরজায় চেইন পড়ল না।