তিনদিন পর, দুপুরবেলা। "রাজার আসর"-এর নিচতলার অফিসে বিক্রম সাহা একা বসে হিসেবের খাতা দেখছিলেন, যখন দরজায় টোকা পড়ল আলতো করে — তার সহকারী জাহিদের বদলে অন্য একটা হাত।
মিতু দাঁড়িয়ে ছিল দরজার বাইরে, একা, শাড়ি নয় এবার — একটা সাধারণ সুতি সালোয়ার কামিজ, চুল বাঁধা পেছনে টানটান করে, চোখে কোনো দ্বিধা নেই। বিক্রম চোখ তুলে তাকালেন, ভুরু একটু উঁচু হলো।
বিক্রম- এটা তো আশা করিনি। রাফিক জানে তুমি এখানে এসেছ?
মিতু- না। আর জানারও দরকার নেই।
সে ভেতরে ঢুকল, দরজাটা নিজের হাতেই বন্ধ করে দিল, তারপর সোজা গিয়ে বসল তার সামনের চেয়ারে, পা ক্রস করে, হাত দুটো কোলের ওপর — একদম সেই ভঙ্গি, যেটা তিনদিন আগে বিক্রম ব্যবহার করেছিলেন তার সাথে কথা বলার সময়।
বিক্রম- বলো, কী কারণে এই সাহস হলো।
মিতু- হিসেব নিয়ে কথা বলতে। আপনি বলেছিলেন পঞ্চাশ লাখের দাম এক রাতে মেটে না। ঠিক কথা। তাহলে বাকি হিসেবটা কীভাবে হবে, সেটা আমি ঠিক করব, আপনি না।
বিক্রম হাসলেন, সেই চেনা ঠান্ডা হাসি, কিন্তু এবার তার চোখে একটা নতুন আগ্রহ জ্বলে উঠল — শিকারি যখন দেখে তার শিকার নিজেই ফাঁদের দিকে হাঁটছে, কিন্তু অন্যভাবে, অন্য চালে।
বিক্রম- তুমি আমার সাথে শর্ত ঠিক করতে এসেছ? তোমার স্বামী যে জিনিসটা বাজি রেখেছিল, সেটা তুমি নিজেই এখন দরকষাকষি করতে চাইছ?
মিতু- আমার স্বামী আমাকে একটা জিনিস হিসেবে বিক্রি করেছে, বিক্রম সাহা। জিনিসের নিজের মুখ থাকে না, এটা আপনি ভুলে গেছেন। কিন্তু আমার আছে।
ঘরে এক মুহূর্ত নীরবতা নামল। বিক্রম তার সিগারেটের প্যাকেটের দিকে হাত বাড়ালেন, তারপর থামলেন, হাতটা টেবিলের ওপর রেখেই দিলেন, যেন মিতুর কথাটা শোনার জন্য পুরো মনোযোগ দরকার।
বিক্রম- বেশ। বলো, কী শর্ত চাও।
মিতু- এক। কবে আসব, সেটা আমি ঠিক করব, আপনি ডাক দিলেই না। দুই। রাফিক জানবে না আমরা কবে কী নিয়ে কথা বলছি — ওই হিসেবের বাইরে ও থাকবে এখন থেকে। তিন...
সে একটু থামল, প্রথমবার তার গলায় সামান্য কাঁপুনি — রাগের না, অন্য কিছুর।
মিতু- তিন। এটা শুধু দেনা শোধের ব্যাপার থাকবে না। আমি যদি আসি, সেটা দেনার জন্য না আসব।
বিক্রম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, ধীরে হেঁটে এলেন টেবিলের এপাশে, মিতুর চেয়ারের ঠিক পাশে এসে দাঁড়ালেন, এত কাছে যে মিতু তার শরীরের গরম অনুভব করতে পারল ঘাড়ের পাশে।
বিক্রম- তাহলে কীসের জন্য আসবে?
মিতু উঠে দাঁড়াল, যাতে তাদের চোখ প্রায় সমান উচ্চতায় আসে — সে লম্বা না হলেও, এই মুহূর্তে তার মেরুদণ্ড সোজা ছিল এমনভাবে যেন সে আর কোনো শিকার নয়।
মিতু- সেটা আমি ঠিক করব, এখন বলব না। আপনি শুধু জেনে রাখুন, বিক্রম সাহা — এই খেলাটা আপনি শুরু করেছিলেন, কিন্তু এখন থেকে চালটা আমি দেব।
বিক্রমের আঙুল উঠে এলো মিতুর থুতনির নিচে, আলতো করে তুলে ধরল মুখটা, কিন্তু এবার সেই স্পর্শে তিনদিন আগের শিকারি হিসেব ছিল না — একটা অন্য স্বীকৃতি ছিল, প্রায় মুগ্ধতার কাছাকাছি।
বিক্রম- তোমার স্বামীর টাকার লোভ ছিল। তোমার কী লোভ, মিতু?
মিতু জবাব দিল না সাথে সাথে। তার শ্বাস একটু ভারী হয়ে এলো, বুক দুটো কামিজের ভেতর থেকে ওঠানামা করতে লাগল দ্রুত, আর বিক্রমের চোখ সেই ওঠানামার দিকেই গেল — কিন্তু এবার হাত বাড়ালেন না, শুধু অপেক্ষা করলেন।
মিতু- আমার লোভ... এটা দেখতে যে আপনার মতো একটা লোক, যে সব হিসেব জানে, যে কখনো হারে না — তাকে কীভাবে হারানো যায়।
বিক্রম নিচু স্বরে হাসলেন, প্রায় গলার ভেতর থেকে, আর সেই হাসির কাঁপুনি মিতুর শরীরের ভেতর দিয়ে একটা অন্যরকম শিহরণ বইয়ে দিল।
বিক্রম- খেলাটা তাহলে চালু থাকুক। তোমার শর্ত মানলাম — সব কটা। কিন্তু একটা শর্ত আমারও আছে।
মিতু- বলুন।
বিক্রম- আমার কাছে এলে, রাফিকের কথা একবারও মুখে আনবে না। ওই ঘরে ও নেই, তুমি নেই — শুধু আমি আর তুমি।
মিতু কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে, তারপর মাথা নাড়ল, খুব আস্তে, যেন নিজের কাছেই একটা শপথ করছে।
মিতু- ঠিক আছে। আজ না। পরের বার, আমি যেদিন বলব।
সে ঘুরে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল, কিন্তু শেষ পায়ের আগে থেমে গেল, কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল পেছনে।
মিতু- ও হ্যাঁ, বিক্রম সাহা। আরেকটা জিনিস জেনে রাখুন। রাফিক যেদিন আমাকে বিক্রি করেছিল, সেদিন রাতে আমি তিনবার শেষ হয়েছিলাম আপনার হাতে। আমার বিয়ের সাত বছরে ওর হাতে একবারও হয়নি।
এই কথা রেখেই সে বেরিয়ে গেল, দরজা নিজের হাতে বন্ধ করে দিয়ে। বিক্রম কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন বন্ধ দরজার দিকে, তারপর নিজের অজান্তেই একটা শব্দ করে হেসে ফেললেন — এমন একটা হাসি, যেটা তার মুখে বহুদিন কেউ দেখেনি, কারণ এই প্রথমবার তিনি বুঝতে পারলেন টেবিলের ওপারে বসা মানুষটা তাকে হারিয়ে দিতে পারে।
তিনি টেবিলের ড্রয়ার খুললেন, একটা পুরনো ডায়েরি বের করলেন যেখানে তিনি তার সব পাওনাদারের হিসেব রাখেন — নাম, তারিখ, অঙ্ক। রাফিক হোসাইনের পাতায় কলম ছোঁয়ালেন, কিন্তু লিখলেন না সংখ্যাটা, শুধু লিখলেন একটা শব্দ পাশে: "মিতু — নতুন নিয়ম।"
বাইরে, সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে মিতুর ফোন বেজে উঠল। রাফিকের নাম্বার। সে স্ক্রিনের দিকে তাকাল একবার, তারপর ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল না ধরেই, মুখে একটা হাসি নিয়ে — এমন একটা হাসি যা তার স্বামী কোনোদিন তার মুখে দেখেনি।
...চলবে...
পাঁচদিন পর। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছিল যখন বিক্রম সাহার ফোনে একটা মেসেজ এলো, নাম্বারটা সেভ করা নেই, কিন্তু বিক্রম জানতেন কার।
মেসেজ- আজ রাত দশটায়। "রাজার আসর" না। আমার নিজের শর্তে একটা জায়গা বেছেছি। ঠিকানা পাঠাচ্ছি। একা আসবেন, আর কাউকে জানাবেন না — এটাও আমার শর্ত।
বিক্রম ফোনের স্ক্রিনের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর নিজের অজান্তেই হেসে ফেললেন। তেতাল্লিশ বছরে বহু মানুষ তার কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসেছে, কিন্তু কেউ কোনোদিন তাকে ঠিকানা পাঠায়নি, শর্ত দেয়নি, ডেকে পাঠায়নি নিজের জায়গায়।
ঠিকানাটা শহরের বাইরের একটা ছোট গেস্টহাউস, নদীর ধারে, যেখানে কেউ তাদের চেনে না। বিক্রম দরজায় টোকা দিলেন রাত দশটা এক মিনিটে, আর দরজা খুলে গেল সাথে সাথেই, যেন মিতু আগে থেকেই হাতে দরজার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে যা পরে ছিল তাতে বিক্রমের শ্বাস একমুহূর্তের জন্য আটকে গেল — গাঢ় লাল একটা ব্লাউজ, গলা অনেকটা নামানো, শাড়ি নয় এবার, একটা পাতলা সিল্কের গাউন হাঁটুর উপর পর্যন্ত, যার নিচে আর কিছু নেই বোঝা যাচ্ছিল তার হাঁটা চলার ভঙ্গিতেই। উনত্রিশ বছরের শরীরটা, ভারী বুক আর ভরাট কোমর, এই প্রথমবার নিজের ইচ্ছেয় সাজানো, কারো আদেশে না।
বিক্রম- তোমাকে অন্যরকম লাগছে।
মিতু- অন্যরকম লাগার কথাই। গতবার আমি শিকার হয়ে এসেছিলাম। আজ আমি নিজে ডেকে এনেছি।
সে সরে দাঁড়াল দরজা থেকে, বিক্রমকে ভেতরে ঢুকতে দিল, নিজের হাতেই দরজা লক করল এবার — গতবারের মতো অন্য কারো হাতে না।
মিতু- বসুন। ওয়াইন ঢেলে রেখেছি, কিন্তু এবার আমি ঢেলেছি, আপনি না।
বিক্রম বসলেন সোফায়, চোখে এক ধরনের কৌতূহল যা তার নিজের কাছেও নতুন ঠেকল। মিতু গ্লাস এগিয়ে দিল, তারপর তার সামনে দাঁড়িয়ে রইল, হাত কোমরে, যেন কোনো পণ্য নয়, বরং বিচারক।
মিতু- আজকের নিয়ম আমি বলব। আপনি শুনবেন, তারপর রাজি হবেন কি না বলবেন।
বিক্রম- বলো।
মিতু- এক। আজ আমি ঠিক করব কখন কী হবে, কতটুকু হবে। দুই। আপনি আমাকে ছোঁবেন শুধু তখনই, যখন আমি বলব। তিন...
সে ঝুঁকে এলো, একদম কাছে, ঠোঁট প্রায় তার কানের কাছে।
মিতু- তিন। আজ রাতে আপনি আমার হবেন, বিক্রম সাহা। শুধু একরাতের জন্য হলেও। আমার।
বিক্রম গ্লাস নামিয়ে রাখলেন টেবিলে, তার চোখে সেই পুরনো শিকারির হিসেব এক মুহূর্তের জন্য পুরোপুরি হারিয়ে গেল, বদলে এলো অন্য কিছু — আত্মসমর্পণের কাছাকাছি একটা অনুভূতি, যা তিনি বহু বছর কারো সামনে অনুভব করেননি।
বিক্রম- রাজি।
মিতু হাসল, সেই হাসি যেটা কয়েকদিন আগে বিক্রমের অফিস থেকে বেরোনোর সময় তার মুখে ছিল, আর এখন সেটা আরও গভীর, আরও ধারালো। সে নিজের হাতে গাউনের ফিতে খুলল, কাঁধ থেকে নামিয়ে দিল একপাশ, তারপর আরেক পাশ, খুব ধীরে, যেন নিজের শরীরের প্রতিটা ইঞ্চি একটা দরকষাকষির অস্ত্র। গাউন পায়ের কাছে পড়তেই বিক্রম দেখলেন ভেতরে সত্যিই কিছু নেই — শুধু সেই ভারী, ভরাট শরীর, বুক দুটো মুক্ত, উরুর ভাঁজে আলোর প্রতিফলন।
মিতু- এখন আপনার পালা। কিন্তু ধীরে। আমি তাড়া দেব না।
সে বিক্রমের শার্টের বোতাম নিজের হাতে খুলতে লাগল, একটা একটা করে, আঙুল বুলিয়ে প্রতিটা খোলা জায়গায়, যেন কোনো ফল পরীক্ষা করছে কেনার আগে। বেল্ট খোলার শব্দ ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো, আর মিতু নিচে নামল, হাঁটু গেড়ে বসল বিক্রমের সামনে — কিন্তু এবার সেই ভঙ্গিতে কোনো পরাজয় ছিল না, বরং একটা মালকিনের নিয়ন্ত্রণ।
মিতু মুখ দিয়ে নিল তাকে, ধীরে, নিজের তালে, থামল যখন ইচ্ছে, আবার শুরু করল যখন ইচ্ছে, আর প্রতিবার বিক্রমের শ্বাস ভারী হতে দেখে তার নিজের ভেতরে একটা নতুন নেশা জন্ম নিল — ক্ষমতার নেশা, শরীরের চেয়েও তীব্র।
বিক্রম- মিতু... আর পারব না চুপ থাকতে।
মিতু- এখনই থামুন তাহলে।
সে থামল, দাঁড়াল, বিক্রমের কোলের ওপর উঠে বসল নিজের ইচ্ছেয়, দুই হাঁটু তার দুপাশে, বুক দুটো তার মুখের সামনে দুলছিল। বিক্রম হাত বাড়ালেন, কিন্তু মিতু সেই হাত সরিয়ে দিল নিজের হাতে।
মিতু- না। আজ হাত আপনার পাশেই থাকবে, যতক্ষণ না আমি বলি।
সে নিজেই নিজেকে নামিয়ে আনল তার ওপর, ধীরে, প্রতিটা ইঞ্চি নিজের নিয়ন্ত্রণে, আর যখন সম্পূর্ণ ডুবে গেল, তার মুখ থেকে একটা দীর্ঘ আর্তনাদ বেরিয়ে এলো যেটা সে নিজেই আটকাতে পারল না। বিক্রম নিচ থেকে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে, হাত মুঠো করে পাশে, কারণ এই প্রথমবার তিনি সত্যিই আদেশ মানছিলেন।
মিতু- বিক্রম... এটা... এত গভীরে...
বিক্রম- তুমিই গতি ঠিক করছ, মিতু। আমি শুধু অপেক্ষা করছি।
মিতু দুলতে লাগল, প্রথমে ধীরে, তারপর নিজের ভেতরের তাড়নায় দ্রুত, আরও দ্রুত, তার ভারী বুক দুটো বিক্রমের মুখের সামনে উথালপাতাল, ঘাম চকচক করতে লাগল তার ত্বকে। প্রথমবার যখন সে কাঁপল, তার হাত আপনা থেকেই বিক্রমের কাঁধ খামচে ধরল, নিয়ম ভেঙে।
মিতু- ধরুন আমাকে... এখন ধরুন...
এই অনুমতি পেয়েই বিক্রমের ভেতরের ধৈর্য ভেঙে গেল, তিনি তার কোমর দুই হাতে চেপে ধরলেন, নিজে থেকে ঠেলা দিতে লাগলেন নিচ থেকে, আর মিতু চিৎকার করে উঠল, তার মাথা পেছনে হেলে গেল, চুল পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।
বিক্রম তাকে তুলে নিয়ে গেলেন বিছানায়, শুইয়ে দিলেন, এবার নিজে নেতৃত্বে, কিন্তু মিতুর চোখের দিকে বারবার তাকিয়ে দেখলেন অনুমতি আছে কি না — এই একটা ছোট পরিবর্তন, যেটা মিতু লক্ষ্য করল, আর বুঝল সে সত্যিই কিছু জিতে নিয়েছে।
তিনি পায়ের তলা থেকে কাঁধে তুলে ধরলেন মিতুর পা দুটো, গভীরে ঠেলে দিলেন নিজেকে, আর ঘরের ভেতর শুধু দুজনের শ্বাস, চামড়ার সাথে চামড়ার শব্দ, আর মিতুর গলা থেকে বেরিয়ে আসা একটার পর একটা শব্দ ছাড়া আর কিছু রইল না। দ্বিতীয়বার যখন সে ভাঙল, তার শরীর পুরোপুরি অবশ হয়ে এলো কয়েক মুহূর্তের জন্য, আর বিক্রম তখনও থামলেন না, ধীরে কিন্তু অবিরাম, যেন তার শরীরে সময়ের কোনো সীমা কখনো ছিল না।
রাত গভীর হতে হতে মিতু তৃতীয়বার কেঁপে উঠল, এবার তার মুখ থেকে কোনো শব্দ বেরোলো না, শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস, গভীর থেকে গভীরে, আর তারপর সে বিক্রমের বুকের ওপর নিস্তেজ হয়ে পড়ল, হাত তার বুকের ওপর রেখে।
মিতু- আজ রাতটা... আজ রাতটা আমার ছিল।
বিক্রম- তোমার শর্তেই। প্রতিটা।
মিতু মাথা তুলল, চোখে একটা হিসেবি ঝিলিক, যেটা ঠিক বিক্রমেরই মতো দেখতে।
মিতু- তাহলে পরের শর্তও আমিই ঠিক করব, বিক্রম সাহা। আর তার পরেরটাও।
বিক্রম কিছু বললেন না, শুধু তার কপালে একটা চুমু খেলেন, এমন একটা ভঙ্গিতে যা তার নিজের কাছেও অচেনা — একজন শিকারি, যে বুঝতে শুরু করেছে সে নিজেই শিকার হয়ে যাচ্ছে।
...চলবে...
রাত প্রায় চারটায় মিতু গেস্টহাউস থেকে বেরিয়ে একা একটা রিকশা নিল, চুল এখনও একটু এলোমেলো, ঠোঁটে একটা হাসি যা সে মুছে ফেলার চেষ্টাও করল না। ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখল রাফিক জেগে বসে আছে সোফায়, সামনে অনেকগুলো সিগারেটের টুকরো ছাই হয়ে পড়ে আছে অ্যাশট্রেতে।
সে সোজা হেঁটে গেল বেডরুমের দিকে, রাফিক পেছন পেছন উঠে দাঁড়াল, গলায় এক ধরনের মরিয়া ভাব যা আগে কখনো মিতু তার মধ্যে দেখেনি।
রাফিক- মিতু, আমি জানি তুমি রাগ করে আছ, কিন্তু আমরা একসাথে এর ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। আমি চেষ্টা করছি টাকাটা জোগাড় করতে, তাহলে আর তোমাকে যেতে হবে না...
মিতু থামল, ঘুরে দাঁড়াল তার দিকে, চোখে কোনো রাগ ছিল না এবার, যেটা ছিল সেটা আরও ভয়ঙ্কর — একটা ঠান্ডা, হিসেবি করুণা।
মিতু- তুমি ভাবছ আমি এখন আর টাকার জন্য যাচ্ছি, রাফিক?
রাফিক- মানে কী?
মিতু- মানে, তুমি পঞ্চাশ লাখ টাকার জন্য আমাকে বিক্রি করেছিলে। আমি এখন নিজের জন্য যাই। তুমি টাকা জোগাড় করলেও আমি যাব।
ঘরে একটা নিস্তব্ধতা নেমে এলো যা রাফিকের মুখের রং বদলে দিল। সে বসে পড়ল বিছানার কিনারে, মাথা দুই হাতে চেপে ধরল।
রাফিক- তুমি... তুমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছ?
মিতু হেসে উঠল, এমন একটা হাসি যেটা রাফিকের বুকে ছুরির মতো বিঁধল।
মিতু- ভালোবাসা? না, রাফিক। এটা ভালোবাসা না। এটা হলো— প্রথমবার কেউ আমাকে একটা জিনিস হিসেবে না দেখে, একটা মানুষ হিসেবে চেয়েছে, যার কথার দাম আছে। তুমি আমাকে সাত বছর ধরে একটা আসবাবপত্রের মতো ব্যবহার করেছ, আর শেষে বাজির টেবিলে বসিয়ে দিয়েছ। ও অন্তত আমাকে জিজ্ঞেস করে।
রাফিক- আমি ক্ষমা চাইছি, মিতু, আমাকে আরেকটা সুযোগ দাও...
মিতু- সুযোগ? কীসের সুযোগ, রাফিক? তুমি এখনও বুঝতে পারছ না, তাই না? এই খেলাটা আর তোমার হাতে নেই। অনেকদিন আগেই চলে গেছে।
সে আলমারির দিকে এগিয়ে গেল, নিজের কাপড় গুছাতে শুরু করল নিরুত্তাপ হাতে, যেন রাফিক ঘরে নেই। রাফিক পেছন থেকে তার হাত ধরতে গেল, কিন্তু মিতু হাতটা সরিয়ে দিল এমন দৃঢ়তায় যা আগে কখনো তার মধ্যে ছিল না।
রাফিক- তুমি আমাকে ছেড়ে যাচ্ছ?
মিতু- না। এখনই না। তোমার দেনা এখনও পুরোপুরি শোধ হয়নি, মনে নেই? আর আমি... আমি ঠিক করেছি শেষ পর্যন্ত এই খেলাটা খেলব, আমার নিয়মে। তুমি শুধু বসে থাকবে আর দেখবে, রাফিক। এটাই এখন তোমার ভূমিকা।
রাফিক কাঁদো কাঁদো গলায় কিছু বলতে গেল, কিন্তু মিতু ঘুরেও তাকাল না, বাথরুমের দরজা বন্ধ করে দিল তার পেছনে। শাওয়ারের পানির শব্দের নিচে, আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে সে ফিসফিস করে বলল একটা নাম, বিক্রমের না, নিজের।
মিতু- (আয়নায় নিজেকে) তুমি কখনো ভাবোনি তুমি এটা পারবে, তাই না, মিতু? এখন দেখো।
পরদিন সকালে মিতুর ফোনে একটা মেসেজ এলো, অচেনা একটা নাম্বার থেকে, যেটা পরিচিত একটা নামে সেভ হয়ে গেল সাথে সাথেই তার মনে — তৃণা, তার ছোট বোন, যে গত ছয় মাস ধরে শহরের বাইরে স্বামীর সাথে থাকছিল, আর হঠাৎ ফিরে আসার কথা জানাচ্ছিল।
তৃণা (মেসেজ)- আপু, আমি কাল ঢাকায় আসছি। কিছুদিন তোমার কাছে থাকব, যদি সমস্যা না হয়। তোমার আর দুলাভাইয়ের মাঝে সব ঠিক আছে তো?
মিতু ফোনের স্ক্রিনের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল, ঠোঁটে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল — একদিকে বোনের প্রতি ভালোবাসা, অন্যদিকে একটা নতুন হিসেব, যেটা তার মাথায় সবে জন্ম নিতে শুরু করেছে। সে জানালার বাইরে তাকাল, "রাজার আসর"-এর দিকের রাস্তাটার কথা ভাবল, আর ভাবল বিক্রম সাহার কথা, আর ভাবল তৃণার কথা — একসাথে, একটা নতুন বাজির ছক কষতে কষতে, যেটায় এবার ঘুঁটি সাজানোর ক্ষমতা পুরোপুরি তার নিজের হাতে।
মিতু- (মনে মনে) তুমি সময়মতো এসেছ, তৃণা। এই খেলাটায় তোমারও একটা জায়গা আছে হয়তো।
সে জবাব লিখল বোনকে, মুখে স্বাভাবিক হাসি জুড়ে দিয়ে।
মিতু (মেসেজ)- চলে আয়, তৃণা। সব ঠিক আছে। বরং তুই এলে আরও ভালো হবে।
জানালার কাচে সকালের রোদ পড়ছিল তার মুখে, আর সেই আলোয় মিতুর চোখে যে চকচকে ভাবটা ছিল, সেটা আর কোনো শিকারের চোখ না — সেটা ছিল একজন খেলোয়াড়ের চোখ, যে সবেমাত্র বুঝতে পেরেছে তার হাতে আরও কত ঘুঁটি আসতে চলেছে।