চৈত্রের মেলার জন্য রাজবাড়ির উঠোনে আজ সকাল থেকেই কাঠ পড়ছে। ভজু দুই দল কারিগরকে হুকুম দিচ্ছে, দরবারের দিক থেকে মন্ত্রীর লোকেরা রসদের তালিকা নিয়ে আসছে-যাচ্ছে, আর নদীপাড়ের দিক থেকে ভেসে আসছে মাদল — কারও মহলা, কারও বাজি।
রুদ্রসেন হাতিশালা থেকে ফিরে স্নান করছিল, তখনই আরেকটা শব্দ এল। গাড়ির চাকা, পাথরে।
ভজু ছুটে এসে দাঁড়াল, কাঁধে তখনো তোয়ালে।
ভজু- যুবরাজ, গাড়ি।
রুদ্র- কার?
ভজু- মহারাজের জেঠার মেয়ে। নন্দিনী দিদিমণি।
রুদ্র- কে পাঠাল?
ভজু- তিনি নিজেই এসেছেন। গাড়োয়ান বলছে, রাস্তায় রাত কাটিয়েছেন।
রুদ্রসেন জলের মধ্যে এক মুহূর্ত থেমে গেল। ছয় বছর আগে যে মেয়েটা এই বাড়ি ছেড়ে গিয়েছিল, খাতায় তার নামটা তারপর থেকে একটা ফাঁকা লাইন মাত্র — কারণ উত্তরাধিকারের হিসাবে তার কিছুই নেই।
উঠোনে গাড়োয়ান গাড়িটা ঘুরিয়ে দিচ্ছিল, আর তার পাশে নামানো ছিল একটা পিতলের সিন্দুক আর দুটো মোটা গোঁজের বালিশ — মামার বাড়ি থেকে পাঠানো সম্বল, এতটুকুই। কারিগরেরা কাজ থামিয়ে তাকাল, তারপর আবার কাঠ ঠুকতে লাগল। এই বাড়িতে নতুন মেয়ে নামা মানে নতুন গল্প, আর গল্পটা সন্ধ্যার আগেই অন্তঃপুরের প্রতিটা ঘরে পৌঁছে যাবে।
সে উঠোনে নামল, আর প্রথমে কারও সঙ্গে চোখ মেলাল না। পায়ে সস্তা চামড়ার জুতা, হাতে একটা পিতলের সিন্দুক, আর গায়ে ধোয়া-রঙা কটন শাড়ি, যেটা তার গায়ে ছোট হয়ে গেছে। ছোট, কিন্তু পারছে না ঢাকতে — ভারী বুকের ওজন কাপড়ের তলায় প্রতিটা পায়ে নামছে, আর সেই ওজনটাই সবচেয়ে বেশি কথা বলছে।
ভবানী দেবী বারান্দার ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর ভাতিজি উঠোনে পা রাখার আগেই কথা বললেন।
ভবানী- নন্দিনী।
নন্দিনী- রানিমা।
ভবানী- শাড়িটা বদলাবি। এই বাড়িতে অত ফিকে পরে বেড়ানো ভালো দেখায় না।
নন্দিনী- বদলাব। তবে তার আগে একটা কথা — ছয় বছর এই বাড়ির কেউ আমার খোঁজ নেয়নি, আজ এসে শাড়ির হিসাব?
উঠোনে কাঠ ঠোকা থেমে গেল। কারিগরেরা মাথা নিচু করল, আর বারান্দার এক কোণে দাঁড়ানো চন্দ্রলেখা পানের বাটা খুলে হাসলেন — তার নিজের হাসি, শব্দ ছাড়া।
ভবানী দেবী কিছু বললেন না। তিনি ঘুরে ভিতরে চলে গেলেন, আর তার কাচের চুড়ি একবার পাথরে বাজল।
রুদ্রসেন কাছে এসে সিন্দুকটা নিজে হাতে তুলে নিল।
রুদ্র- বাড়িতে সব ঠিক?
নন্দিনী- কার বাড়ি?
রুদ্র- এই বাড়ি।
নন্দিনী- ছয় বছর আগের বাড়ি, নাকি এই বাড়ি?
সে হেঁটে গেল, আর সিঁড়ির মাথায় এসে থেমে গেল। ওই পাথরে একটা ওড়না পড়ে আছে — ফিকে হয়ে গেছে, কোণা ছিঁড়েছে।
নন্দিনী- এটা কার?
ভজু- জানি না, দিদিমণি।
নন্দিনী- এত বড় বাড়ি, সিঁড়ির মাথায় একটা ওড়না পড়ে আছে, আর কেউ তোলেনি।
রুদ্রসেন উত্তর দিল না। সে দরজা খুলে দিল, আর নন্দিনী ভিতরে ঢুকে ছয় বছরের ধুলোর ঘরে দাঁড়াল — টিনের বাক্স, একটা সায়া, আর জানালার ওপাশে ঘোড়ার আস্তাবলের ছাদ, যেখান থেকে রাতে টাপ শোনা যায়।
নন্দিনী- আমার ঘর।
রুদ্র- তুই চলে গিয়েছিলি।
নন্দিনী- যাইনি। পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পার্থক্যটা মনে রাখিস।
সে টিনের বাক্সটার দিকে এগিয়ে গেল, আর তার ভিতর থেকে তুলে আনল একটা ছোট পিতলের বালা — বাচ্চা হাতের মাপ, যে হাতে তাও এখন আর ওঠে না।
নন্দিনী- আমার নিজেরই ছিল। ছয় বছর আগে ওরা আমার মায়ের সিন্দুকের সঙ্গে এটা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল। এই বাড়ির সঙ্গে আমার সম্পর্কের শেষ নিদর্শন।
রুদ্র- এখন কী করবি?
নন্দিনী- এখন হাতে পরব। ছোট হলেও পরব।
নন্দিনী- আর তুই এখন বাইরে কারও বাড়ির ছেলে নেই। তুই অন্তঃপুরের মালিক। শুনলাম।
রুদ্র ঘরের ভিতরে এসে দাঁড়াল, আর দরজাটা বন্ধ করল না। ধুলোর ঘরে গন্ধটা ছিল চেনা, আর তার সঙ্গে এখন একটা নতুন গন্ধ — রাস্তার ঘাম, সস্তা সাবান আর শুকনো ঘাস।
সে কাছে এসে দাঁড়াল, আর নন্দিনী পিছোয়নি। বরং হাত বাড়িয়ে তার ধুতির গিঁটটা খুলে ফেলল, তারপর দুই আঙুল দিয়ে বাড়াটা হাতের তলায় চেপে ধরল — একবার, পরখ করার মতো। রুদ্র তার কব্জি ধরে টেনে নিয়ে কোমর জড়িয়ে ধরল, আর ধুলোর ঘরে দুইজনের শ্বাস একবার এক হয়ে গেল।
নন্দিনী- এখন না।
রুদ্র- কেন?
নন্দিনী- কারণ এখন সকাল, আর এই বাড়ির সব দরজা এখনো খোলা। রাতে আয়।
রুদ্র- কোন দরজা?
নন্দিনী- এই। আমার। আর এই বাড়ির কাউকে দেখতে দিস না।
রুদ্র- কেউ দেখলে?
নন্দিনী- দেখলে ভালোই। তাহলে কাল থেকে সবাই জানবে, জেঠার মেয়েটাও ফিরে এসেছে — কিছু নিতে।
রুদ্রসেন বেরিয়ে এল। উঠোনে কারিগরেরা আবার কাঠ ঠুকছে, আর নদীপাড়ের মাদলটা এখন আরও কাছে এসেছে।
সিঁড়ির ওপরে ঝরোখার আড়ালে কেউ ওকে দেখছিল। কাচের চুড়ি একবার বাজল, তারপর থেমে গেল।
রাত দশটার দিকে রুদ্রসেন উত্তর-বারান্দা ধরে এল। উঠোনে আজ তাঁবুর খুঁটি গাড়া হয়েছে, তাই আলোটা নিচের দিকেই থাকে — ওপরে সিঁড়িতে শুধু অন্ধকার।
দরজাটা খোলা। ভিতরে মাটির প্রদীপ জ্বলছে, আর টিনের বাক্সটার ওপর বসে আছে নন্দিনী। গায়ে সাদা সুতির পুরনো নাইটি।
নন্দিনী- দরজা লাগাবি না।
রুদ্র- কেন?
নন্দিনী- এই বাড়িতে এখন নিয়ম বদলেছে, রানিমা সভা করে বলে দিয়েছেন। এখন কেউ দরজা লাগায় না। তুই পিছিয়ে যাবি আরেকবার?
রুদ্র ভিতরে ঢুকে বসল, আর চারপাশের গন্ধটা চিনে ফেলল — ওই পুরনো তালা, শুকনো ধুলো, আর মশারির ওপর জমে থাকা ছয় বছরের কাঠ।
নন্দিনী- জানিস, ছেলেবেলায় এই ঘরে একটাই জানালা ছিল, আর সেটার পর্দা মেঝে ছোঁত না।
রুদ্র- মনে আছে।
নন্দিনী- তখন আমি নিচ দিয়ে তোর ঘরদোর দেখতাম, আর ভাবতাম বড় হয়ে ওই ঘরে ঢুকব।
নন্দিনী- এখন দেখছি, ও ঘরটার দরজা কারও লাগানো থাকে না।
সে রুদ্রের দিকে হাত বাড়াল, আর নিজেই তার কাঁধ থেকে কাপড়টা নামিয়ে দিল। তারপর নিচু হয়ে কাঁধের ওই জায়গাটায় ঠোঁট রাখল, যেখানে পিসিমার পট্টি এখনো লাগানো।
নন্দিনী- এখানে আগেও কেউ কামড়েছে।
রুদ্র- তুই জানিস কে?
নন্দিনী- জানতে হবে না, ভাই। জেনে কী করব, আরেকটা নাম মনে রাখব?
তারপর সে নিজের নাইটিটার নিচের সুতোটা খুলে দিল, আর এক টানে মাথার ওপর দিয়ে তুলে ফেলল। বুকটা বেরিয়ে এল ভারী হয়ে, আর দেখার জন্য গায়ে কোনো চিহ্ন নেই ছাড়া একটা তিল, ঠিক বুকের নিচে। জন্তুর মতো সরু কোমর, আর তার তলায় মাংসল পাছা, টিনের বাক্সের কিনারায় বসে দুইদিকে ছড়িয়ে।
নন্দিনী- দেখে যতক্ষণ খুশি, তারপর হাত দে।
রুদ্র- তুই সময় দিচ্ছিস?
নন্দিনী- এই বাড়িতে এখন কেউ সময় দেয় না। জোরে করবি না।
সে হাত দিল। প্রথমে বুকের নিচে, তারপর কোমরের ওপর, তারপর পাছার গভীরে — পর্দার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে তার ফিকে শাড়িটার ওপর পড়ছে, যেটা এখনো মেঝেতে কুঁচকানো।
নন্দিনী- আহহহ রে।
নন্দিনী- আঙুল দে। হ্যাঁ, সেখানেই।
নন্দিনী- ইসসসস। এই বাড়ির ছেলেরা সব একরকম। আঙুল দিতে জানে, তারপর লুকোতে যায়।
রুদ্র তার দুই পা ফাঁক করে নিজের দিকে টেনে নিল, হাঁটু গেড়ে বসল। বাড়াটা যখন তার উরুর ওপর গিয়ে ঠেকল, সে নিচে হাত বাড়িয়ে নিজেই হাতের তলায় পরখ করে দেখল — একবার, ধীরে।
নন্দিনী- এতটা?
রুদ্র- এখনো খুব দেরি হয়নি।
নন্দিনী- দেরি হবে না। আমি চাই এটা আজ রাতেই শেষ হোক।
রুদ্র- নন্দিনী।
নন্দিনী- হ্যাঁ, আমি কুমারী। এটা এই বাড়িতে কেউ জানে না, আর বাজারে ওটার দামও নেই। আজ থাক।
তিনি নিজেই নিচে শুলেন বাক্স থেকে নামা চাদরটার ওপর, হাঁটু দুটো তুলে, আর হাত দিয়ে রুদ্রের বাড়াটা ধরে ভিতরে বসিয়ে দিলেন।
প্রথমে ঢুকল না। তিনি ভিতরে মুঠো করে ধরে রইলেন, একটা লম্বা শ্বাস ফেললেন, তারপর হাত দুটো দিয়ে নিজের হাঁটু চেপে ধরে বললেন।
নন্দিনী- আরেকটু। ঠেল।
রুদ্র- ব্যথা করবে।
নন্দিনী- করুক।
ঠেলার পর ফাঁক হয়ে গেল, আর তার গলার ভিতর থেকে একটা ছোট চিৎকার বেরিয়ে গেল — বেশি নয়, ঠিক ততটা যতটা বাড়িটা শুনতে পায় নিরাপদ। তারপর দ্বিতীয়বার ঠাপ, আর তৃতীয়বারে সে নিজেই কোমর তুলে দিতে লাগল।
নন্দিনী- আহহহ।
নন্দিনী- এখন চোদ। আস্তে না, জোরে।
রুদ্র ঠাপ দিতে লাগল, আর নন্দিনী নিজের বুক দুটো খামচে ধরল যাতে সেগুলো আর পাঁচ ইঞ্চি লাফায় না। তার নিচের চাদরে এক ফোঁটা রক্ত এল, তারপর আরও একটা — ছোট, কিন্তু চাদরে পড়েছে।
সে থেমে গেল। নন্দিনী সেটা দেখল, তারপর হাসল — সত্যি হাসল, পেট ভরে।
নন্দিনী- ওটার হিসাব কাল কেউ রাখবে না।
রুদ্র- তোর মা…
নন্দিনী- আমার মা মরে গেছে বছর আগে। মামার বাড়ির কেউ এসে খোঁজ করবে না।
নন্দিনী- তবে একটা কাজ কর। চাদরটা ধোবিতে দিস না। আগুনে পুড়িয়ে দিস।
তারপর সে উঠে বসল, রুদ্রকে টেনে শুইয়ে দিল, বাক্সের ওপর ভর দিয়ে নিজেই তার ওপর চড়ে বসল। সায়ার কোমরটা খুলে ফেলে দিল, আর নাইটি হাতে রেখে বলল — নেমো না, আমি নিজে করব।
নন্দিনী- তুই শুধু হাত দে আমার পাছায়।
নন্দিনী- আর আমার বুকের লোকটায় চোখ রাখে যতক্ষণ পারিস।
পনেরো মিনিটের মধ্যে সে দুবার এল। দুইবারেই তার পা দুটো একসঙ্গে কেঁপে উঠল, আর দুইবারেই সে নিজের হাতের পিছনটা কামড়ে শব্দটা চেপে ফেলল। সে থামল না।
তারপর করিডোরে পায়ের শব্দ হলো — একটা, তারপর আরেকটা। আলো। দরজার বাইরে লণ্ঠন।
তারা- যুবরাজ?
নন্দিনী চাদরটার নিচে গড়িয়ে ঢুকে পড়ল, আর রুদ্রসেন উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল, পিঠে তোয়ালেটা টেনে নিয়ে।
রুদ্র- কে?
তারা- আমি, তারা। রানিমা পাঠিয়েছেন। বলেছেন, অতিথির ঘরে মশা আছে, এই ধূপটুকু দিয়ে যেতে।
রুদ্র- দরজার বাইরে রাখ।
তারা- রাখছি।
লণ্ঠনের আলো সরে গেল, শব্দ পাতলা হয়ে গেল। নন্দিনী চাদরের নিচ থেকে মাথা বের করে ফিসফিস করে হাসল।
নন্দিনী- এই বাড়ির একটা মেয়ে আমার ঘরে এসে ধূপ রেখে গেল, আর তুই পিঠে তোয়ালে দিয়ে শুয়ে আছিস।
নন্দিনী- খুব শীঘ্রই এই বাড়ির সবাই জেনে যাবে, আর আমি চাই তাতে কোনো গোপন না থাকুক।
সে আবার চড়ে বসল, আর এবার ধীরে — নিজের মতো করে। শেষে রুদ্রসেন তার নিতম্বে দুই হাত শক্ত করে ধরে বাড়াটা বের করে নিল, আর মাল পড়ল তার পেটের ওপরে, সেই ছোট তিলটার ঠিক পাশে।
নন্দিনী- ওখানেই থাকুক।
নন্দিনী- আমি এই বাড়িতে কিছু চাই না। একটা আসন চাই, তোর মায়ের সভায়।
রুদ্র- আসন?
নন্দিনী- আজ থেকে আমার নামও যেন ওই ঘরের খাতায় লেখা থাকে। চাদরে লেখা থাকলে ধুয়ে যায়। মুখে লেখা থাকলে যায় না।
নন্দিনী- কাল সকালে কাল সভা হলে আমি সেখানে বসব।
ঘরটা তারপর অনেকক্ষণ ধরে নিস্তব্ধ ছিল, আর সেই নিস্তব্ধতার ভিতর দিয়ে বাইরের উঠোন থেকে তাঁবুর দড়ি টানাটানির আওয়াজ আসছিল।
সকালবেলা দরবার-ঘরে মন্ত্রী শিবানন্দ এসে দাঁড়ালেন, আর তার হাতে খাতার পাশে একটা রুপোর নলের পত্র — ভৈরবগড়ের সীলমোহর।
শিবানন্দ- যুবরাজ, ভৈরবগড় থেকে দূত এসেছেন।
রুদ্র- কী চায়?
শিবানন্দ- সন্ধি চায়। আর সন্ধির শর্তে একটা বিয়ে।
রুদ্রসেন খাতাটা খুলে দেখল, তারপর বন্ধ করে রাখল। পাশের ঘরে মহারাজের কাশিটা তখনো এই ঘরে লেগে আছে, আর তার সঙ্গে ওষুধের গন্ধও।
রুদ্র ভজুর দিকে তাকাল, আর ভজু মাথা নিচু করল। গাড়োয়ানদের মধ্যে কথা যায়, আর ঘাটের গাড়োয়ান ভজুর চেয়ে বেশি জানে না — কিন্তু দুজন নৌকোয় বসে থাকা মানে, চারজনই ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরি।
রুদ্র- কার সাথে?
শিবানন্দ- তাদের রাজা তরুণ। বোনের বিয়ে দিতে চায়।
রুদ্র- আমরা কোন মেয়ে দেব?
শিবানন্দ- এই বাড়িতেই একটা মেয়ে আছে, যার কোনো দাবি নেই, আর যার জন্য দরবারের এক পয়সাও খরচ হবে না।
রুদ্রসেন তার দিকে তাকিয়ে রইল, হাতটা খাতার ওপরে যেতে গিয়ে থামল।
রুদ্র- নন্দিনী।
শিবানন্দ- ভাবিবেন না, যুবরাজ। বয়স কম, রক্ত ভালো, আর ভৈরবগড়ের রাজার বোন থাকবে।
রুদ্র- আপনি কি জানেন সে আমারই রক্ত?
শিবানন্দ- জানি, তাই বলছি। রক্তের হিসাবেই তো সস্তা — কেউ ওর জন্য অশ্রু ফেলবে না।
দরজায় একটা ধাক্কা হলো। লীলাবতী পিসিমা ভিতরে এলেন, আর তার হাতে ওষুধের ছোট পিতলের শিশি।
লীলাবতী- দরবারের হিসাব আমি কিছু বুঝি না, কিন্তু একটা কথা এই ঘরে বলা দরকার। মহারাজের কাশিটা আজ রাতে আরও বেড়েছে।
রুদ্র- কী বলছেন?
লীলাবতী- বলছি, মহারাজের বুকের ওপর হাত রাখলে আওয়াজ শোনা যায়। দুই মাসের বেশি নয়।
লীলাবতী- তার আগেই যদি সিংহাসনের সিঁড়ি ঠিক করা না যায়, তবে এই রাজ্যের হিসাব ভৈরবগড়ই লিখবে।
মন্ত্রী তখন হাত তুলে বলতে গেলেন, কিন্তু ততক্ষণে ঘরের পিছনের পর্দাটা সরছে — আর পর্দার আড়াল থেকে নন্দিনী বেরিয়ে এল, আজ ভবানী দেবী যেটা দিয়েছিলেন সেটা পরেই, একটা গাঢ় নীল শাড়ি।
নন্দিনী- দরবারের হিসাবে আমাকে গুনতে চেয়েছেন, তাই না?
শিবানন্দ- কন্যা, আপনার এই ঘরে আসা উচিত হয়নি।
নন্দিনী- আমি এই ঘরেরই মেয়ে, মন্ত্রীমশাই। দূরের হলেও মেয়ে। আর যাকে বিয়ে দিয়ে ভৈরবগড় পাঠানো হবে, তার থাকা উচিত বিয়েটা কার সাথে হবে, সেটা জানা।
শিবানন্দ- তবে?
নন্দিনী- তবে একটা শর্ত। মহারাজ এখনো জীবিত। তার সিলমোহর ছাড়া আমাকে কেউ বাইরে পাঠাতে পারবে না।
ঘর চুপ। মন্ত্রী খাতা বন্ধ করলেন, আর তার আঙুল থেকে কালির ছোপ লেগে গেল পিতলের নলের পত্রের ওপর।
লীলাবতী- ছেলে, এটা মহারাজকে জানাতে হবে।
রুদ্র- যাব।
নন্দিনী- আমি যাব।
রুদ্র- তুই যাবি না।
নন্দিনী- আমি ওর পাশে দাঁড়াব, চোখের দেখা না হলেও ও শুনতে পাব। মেয়ের গলার আওয়াজ আর মেয়ের গলার আওয়াজ একরকম নয়।
নন্দিনী- আর মহারাজ রোগী। ওর সামনে ভৈরবগড়ের পত্র পড়লে হয়তো ওর মনে পড়বে যে এই বাড়িতে আর একটা বাড়ি আছে, যার নাম তার ভাইয়ের বাড়ি।
মন্ত্রী শিবানন্দ ঘর ছেড়ে গেলেন, আর বারান্দায় বাতাসে ধূপের গন্ধ। দূরে উঠোনে কারিগরেরা তাঁবুর চূড়া টানছে, আর সেই দড়ির টানে সকালের আকাশটা কাঁপছে।
চন্দ্রলেখা এসে দরজায় দাঁড়ালেন, পানের বাটা হাতে। মনের মধ্যে কিছু একটা হিসেব করতে করতে বললেন, একদম শুকনো গলায়।
চন্দ্রলেখা- দুর্দান্ত কথা বলেছ, কন্যা।
চন্দ্রলেখা- তবে জানিস তো — এই বাড়িতে যার আসন যত উঁচু, তার দরজা তত বেশি রাতে বন্ধ থাকে।
করিডোরে চন্দ্রলেখা তার পথ আটকে দাঁড়ালেন, আর পানের বাটাটা রুদ্রের বুকে ঠেকিয়ে রাখলেন।
চন্দ্রলেখা- আজ দরবারে তুই চুপ ছিলি কেন?
রুদ্র- মন্ত্রী তো সব বলে দিল।
চন্দ্রলেখা- মন্ত্রী যা বলে, তা হিসাব। আর হিসাবের সঙ্গে বিছানার হিসাব মেলে না।
চন্দ্রলেখা- শোন। ভৈরবগড় থেকে দূত এসেছে, আর তুই দুই রাত আমার ঘরে আসিসনি।
রুদ্র- তুই গুনে রাখছিস?
চন্দ্রলেখা- রেখেছি। ওটা আমার খাতা।
তিনি বাটাটা নামিয়ে রুদ্রের কোমরে হাত রাখলেন — নিচু, ছোট করে, ঠিক যতক্ষণ লাগে ততক্ষণ — তারপর ছেড়ে দিয়ে সিঁড়ি ধরে উঠে গেলেন।
চন্দ্রলেখা- আজ রাতে আমার দরজা খোলা। তোর নতুন নিয়ম, তাই না?
রুদ্রসেন উঠোনে দাঁড়াল। কারিগরেরা তাঁবুর চূড়ায় দড়ি বাঁধছে, আর নদীপাড় থেকে মাদলটা এখন এত কাছে যে বোঝা যায়, ওরা মেলার পথে হাঁটতে শুরু করেছে।