সকালবেলা মহারাজের ঘরে ঢোকার সময় রুদ্রসেনের হাতে খাতা, আর পিছনে লীলাবতী পিসিমা — হাতে ওষুধের পিতলের শিশি। ভিতরে দুই দাসী পাখা করছিল, আর মহারাজ আজ বসতে পেরেছেন; কারণ আজ তিনি কাশতে কাশতে জেগেছেন, ঘুমে জেগে ওঠেননি।
বিক্রম- হাতে কী?
রুদ্র- মন্ত্রীর খাতা।
বিক্রম- আমার ঘরে মন্ত্রীর খাতা।
রুদ্র- আজ থেকে আপনার ঘরে থাকবে।
বিক্রম- খুলে পড়।
রুদ্র পাতা উল্টে শেষ পাতায় এল। কাগজের কোণা ভাঁজ, লেখা খাড়া, আর লাইনটা ছোট।
রুদ্র- 'ভৈরবগড় — সোনা, ত্রিশ'।
বিক্রম- সোনা কে নিয়েছে?
রুদ্র- মন্ত্রী।
মহারাজ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর হাসলেন — একটা ছোট শুকনো হাসি, আর তারপরেই কাশি। দাসীরা জল এগিয়ে দিল, আর লীলাবতী পিসিমা এগিয়ে গিয়ে তার বুকে হাত রাখলেন।
বিক্রম- আমি একটা জিনিস জানতাম।
রুদ্র- কী?
বিক্রম- জানতাম, আমার হিসাবের ভিতরে একটা লাইন কেউ লিখছে। শুধু জানতাম না কোন লাইনটা ফাঁকা।
বিক্রম- ছেলে, টেবিল থেকে আমার সিলটা নে।
রুদ্র- মহারাজ।
বিক্রম- নে। আমার হাত আর কাঁপে, আর সিল যদি আজ থেকে তুই রাখিস, এই বাড়ির সবাই জানবে কে আসলে রাজা।
লীলাবতী- মহারাজ, আজকের মতো…
বিক্রম- লীলাবতী, তুই চুপ কর। তুই আমার ওষুধ দেখিস, রাজ্য দেখতে হবে ছেলেকে।
সিলটা কাপড়ে মোড়া ছিল, একটা ছোট গোল পিতলের টুকরো, আর তার হাতল শক্ত কাঠের। রুদ্রসেন সেটা তুলে নিল, আর তার ওজন তার হাতের তালুতে এর চেয়ে বেশি লাগল যতটা দেখতে।
সেদিন দুপুরেই দরবার বসল। মন্ত্রী শিবানন্দ এলেন, হাতে নতুন এক খাতা, আর পাশে দাঁড়ালেন ভৈরবগড়ের দূত। তার পিছনে দলিল-লেখক, যার কোলে সেই মোটা ফাইল।
দূত তখন এক পা এগিয়ে এলেন, আর তার গলাটা ধীর ছিল, ঠিক যেন কাগজ পড়ছেন।
দূত- যুবরাজ, আমরা সন্ধির খরচ দিই না। আমরা লোক কিনি।
দূত- আর দাম যেটা, সেটা মন্ত্রী নিজেই ঠিক করেছেন।
ঘরে কোনো শব্দ হলো না। একজন সভাসদ তার চেয়ার ঠিক করলেন, দুজন পলোয়ান পাশে সরে দাঁড়াল। মন্ত্রী তার হাতের নতুন খাতাটা বন্ধ করলেন, তারপর উঠে দাঁড়ালেন।
শিবানন্দ- তবে একটা কথা এই দরবার শুনুক। আপনার ছেলে আপনার অন্তঃপুরের প্রতিটা দরজায় হাত দিয়েছে।
সভাসদদের মধ্যে কেউ একটা শব্দ করল, আর তারপর ঘর এমন নিস্তব্ধ হলো যে বাইরে তাঁবু ভাঙার দড়ির শব্দ শোনা গেল।
রুদ্রসেন উঠে দাঁড়ালেন, আর তার গলাটা একটুও চড়ল না।
রুদ্র- মন্ত্রী।
শিবানন্দ- বলুন।
রুদ্র- আট বছর আপনি আমার বাড়ির হিসাব রেখেছেন। আপনার নিজের ঘরের হিসাব কে রেখেছে?
শিবানন্দ- মানে?
রুদ্র- আপনার সিন্দুকের চাবিটা কার কোমরে বাঁধা, মন্ত্রী?
মন্ত্রী একবার পিছিয়ে গেলেন, আর তার দুই হাত খাতার ওপর চেপে গেল। তিনি আর কিছু বললেন না — দরবারের নিয়মে যার সিল যায়, তার কথা শেষ।
রুদ্র- আপনার খাতা রাজবাড়িতে থাকবে। আপনার ঘরের তালা আপনার ঘরে থাকুক। আর আজ থেকে আপনার কাজ দেখবেন ভজু।
ভজু- যুবরাজ।
রুদ্র- কী?
ভজু- সাহুর ঘরে সিন্দুক আছে, খুললে হয়তো আরও একটা খাতা বেরোবে।
রুদ্র- খুলবেন না। চাবি যার কোমরে, সে খুলবে।
মন্ত্রী বেরিয়ে যাওয়ার সময় দরজায় থেমে গেলেন, আর সোজা যুবরাজের দিকে তাকালেন।
শিবানন্দ- যুবরাজ, একটা কথা শুনে যাই।
শিবানন্দ- এই বাড়িতে এখন যে নিয়ম চলছে, ওটার হিসাব আমি লিখিনি — কেউ লিখবে। আর যেদিন লেখা হবে, সেদিন নামের তালিকাটা আর ছোট থাকবে না।
দরবার ভাঙার পর সিঁড়ির মুখে নন্দিনী দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর তার হাতে সেই ছোট পিতলের বালাটা।
নন্দিনী- নামটা কেটে দিলেন?
রুদ্র- কেটে দিয়েছি।
নন্দিনী- কে কাটল?
রুদ্র- দূত নিজে। কারণ তার রাজা আর বিয়ে চান না, তিনি সন্ধি চান।
নন্দিনী- তাহলে আমি এখন কী?
রুদ্র- এখন তুই এই বাড়ির মেয়ে। নাম আছে।
নন্দিনী- কার খাতায়?
রুদ্র- আমার খাতায়।
নন্দিনী কিছু বললেন না। তিনি শুধু বালাটা আঙুলে ঘুরিয়ে দিলেন, তারপর সিঁড়ি ধরে উঠে গেলেন — তার নূপুর ছিল না, তাই শব্দও হলো না।
দুপুরের খাবারের আগেই চারটে জিনিস ঘটে গেল — দূতের নৌকো ছাড়ল, কিন্তু নন্দিনীর নামটা ফাইল থেকে কাটা হলো; খাজনার সিল যুবরাজের হাতে গেল; মন্ত্রীর ঘরে দুই পলোয়ান দাঁড়াল; আর একটা চিঠি এল, কারও সিল ছাড়া, শুধু একটা পুরনো হাতের লেখা, রানিমা ভবানীর নামে।
মন্ত্রীকে বাড়ি পাঠানোর খবর অন্তঃপুরে পৌঁছতে দুপুর লাগল না। রানিমা ভবানী দেবী একবার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে শুধু বলে গেলেন — আজ থেকে খাজনার খাতা যুবরাজের ঘরে থাকবে, আর সন্ধ্যায় আমার ঘরে। লীলাবতী পিসিমা ওষুধের ঘরে ঢুকে দরজাটা একটু বন্ধ করে নিলেন, কারণ আজ সন্ধ্যায় দরবারের কেউ একজন ওষুধ খেতে আসবেন, আর তিনি আগেই জানতে চান না কে।
ভবানীর হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে রুদ্র পড়ল।
রুদ্র- খালা আসছেন।
ভবানী- কোথা থেকে?
রুদ্র- নিজের জমিদারি থেকে। চারটে গাড়ি, আটজন লোক, আর সঙ্গে তপতী।
ভবানী- কবে?
রুদ্র- কাল সকালে।
ভবানী দেবী চুপ করে রইলেন, আর তার কাচের চুড়িগুলো একবার বাজল — তার পর্বের প্রথম রাতে যেভাবে বাজেছিল, ঠিক সেভাবে।
খালা আসার দিন সকালবেলায় রাজবাড়ির উঠোন ভরে গেল। চারটে গাড়ি, আটজন লোক, দুটো বাক্স, একটা খাঁচায় তিনটে পায়রা, আর একটা কালো কালো কুকুর যেটা তাড়াতাড়ি উঠোনের পিছনের দেয়ালে গিয়ে বসে পড়েছে।
শর্মিষ্ঠা নিজে নামলেন সবার শেষে, কারণ যিনি নামেন শেষে, তাকেই সবাই দেখে।
শর্মিষ্ঠা- এই যে! আমার বোনের বাড়ি, আর আমার বোনের বাড়ির সিঁড়ি এখনো এই রকম ছোট!
ভবানী- শর্মিষ্ঠা।
শর্মিষ্ঠা- দিদি, তুই আরও রোগা হয়ে গেছিস।
ভবানী- তুই আরও ভারী।
শর্মিষ্ঠা- হবেই। তোর জামাই মরে যায়নি, আমার মরে গেছে। দুঃখে মানুষ ভারী হয়।
তারপর তিনি রুদ্রসেনের কাছে এলেন, আর তাকে বুকে চেপে ধরলেন এক মুহূর্ত বেশি সময়।
শর্মিষ্ঠা- বড় হয়ে গেছিস।
রুদ্র- খালা।
শর্মিষ্ঠা- আর শুনলাম তুই এখন অন্তঃপুরের মালিক। মেলার লোক কী বলে, জানিস?
রুদ্র- কী বলে?
শর্মিষ্ঠা- বলে, সুবর্ণগড়ের যুবরাজ এখন এক বাড়ির মালিক, আর সেই বাড়ির প্রতিটা মেয়ে কোন দরজা খোলা রাখবে, সেটা নিজেই ঠিক করে।
শর্মিষ্ঠা- আমি ভাবলাম, আসার আগে নিজে দেখে যাই কথাটা সত্যি কি না।
রুদ্র কিছু বলল না, আর শর্মিষ্ঠা তার হাতটা তার কাঁধের ওপর রেখে রইলেন, তারপর একটু চাপ দিয়ে ছেড়ে দিলেন।
পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল তপতী — ঊনিশের একটা চুপচাপ মেয়ে, মায়ের মতো লম্বা নয়, শুধু চোখ দুটো তীক্ষ্ণ। সে কারও দিকে তাকাল না, শুধু একবার মন্ত্রীর খালি ঘরের দিকে তাকাল, তারপর আবার নিচে।
সন্ধ্যায় শর্মিষ্ঠা অতিথি-ঘরে গেলেন না। তিনি নিজেই বললেন, পশ্চিমের ঘরটা তার, আর সেটা সভার ঘরের পিছনে।
ভবানী- সেখানে শুধু চন্দ্রলেখা থাকে।
শর্মিষ্ঠা- থাকুক। আমি তোর বোন, আর বোনের জায়গা সবসময় ভিতরের দিকেই হয়।
রাত দশটায় রুদ্রসেন সেই ঘরের দরজায় এল। দরজা খোলা, ভিতরে প্রদীপ জ্বলছে, আর শর্মিষ্ঠা বাক্সের ওপর বসে চুল আঁচড়াচ্ছেন। গায়ে হালকা একটা কাপড়, আর পিঠে একটা লম্বা দাগ — ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ার।
শর্মিষ্ঠা- দরজা লাগা। আমি বিধবা, কিন্তু ষোলো বছরের বিধবা নই।
রুদ্র- খালা।
শর্মিষ্ঠা- খালা ডাকিস না। তুই তো এখন অন্তঃপুরের মালিক।
শর্মিষ্ঠা- বোস।
রুদ্র- দাঁড়িয়ে থাকব।
শর্মিষ্ঠা- দাঁড়িয়ে থাক। কিন্তু জেনে রাখ, আমি তোর মায়ের বোন, আর আমি তোর মায়ের চেয়ে কম জানি না।
রুদ্র উঠে দাঁড়াল আর তার হাত দিয়ে চুলটা সরিয়ে দিল। শর্মিষ্ঠা তার আঙুল ধরে নিজের কাঁধে রাখলেন, তারপর সেটা নিজের বুকের দিকে নামিয়ে নিলেন — ধীরে, নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে।
শর্মিষ্ঠা- আটত্রিশের মেয়ের কাছ থেকে এখন তুই যা শুনবি, সেটা দিনের হিসাবে শুনবি না।
শর্মিষ্ঠা- আমার বাড়িতে সব আছে — জমি, গোরু, লোক। শুধু একটা জিনিস নেই। বিছানার পাশে যার গলা শোনা যায়।
রুদ্র- খালা, তুই কী চাস?
শর্মিষ্ঠা- চারটে রাত। তোর এই বাড়িতে।
শর্মিষ্ঠা- আর একটা বারোয়ারি মেলা — যেখানে আমি তোর খরচে একটা দোকান করব, আর কেউ বলতে পারবে না যে বিধবা মেয়ে বাজারে বসেছে।
রুদ্র তার কাঁধে দুই হাত রাখলেন, আর শর্মিষ্ঠা নিজেই কাপড়টা নামিয়ে ফেললেন এক টানে। বুকটা ভারী, আর বয়সের হিসাবে নিচে একটু নামা, কিন্তু তার তুলনায় এই বাড়ির কেউ নেই। পেটে সন্তান হওয়ার নরম ভাঁজ, আর পাছা চওড়া।
শর্মিষ্ঠা- আস্তে। আমি একা থাকতে থাকতে নিজের শরীর ভুলে গিয়েছিলাম।
রুদ্র- কত দিন?
শর্মিষ্ঠা- ষোলো।
সে তাকে পালঙ্কের কিনারায় বসিয়ে দিল, তারপর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল, আর নিজের হাতে বাড়াটা বের করে মুখে নিল — না তাড়াহুড়ো করে, না শিক্ষিত লোকের মতো। মাঝপথে থেমে চোখ তুলে তাকালেন।
শর্মিষ্ঠা- এটা তোর কাছে কেউ রেখে গেছে।
শর্মিষ্ঠা- ইসসস। তবু প্রথমে দাঁড়া। আমি নিজে নেব।
তিনি উপরে উঠে বসলেন, জায়গা ঠিক করে, তারপর নিজের হাতে ধরে ধীরে ধীরে ভিতরে বসিয়ে দিলেন — আর তার পিঠটা খিলানের মতো উঠে গেল।
শর্মিষ্ঠা- আঃ-আ-আ…
শর্মিষ্ঠা- এখন ঠেল। কিন্তু চিৎকার করব না, এই বাড়িতে দরজা লাগানো নিয়ম নেই।
রুদ্র ঠাপ দিতে লাগল, আর তিনি দুই হাতে তার কাঁধ চেপে ধরলেন। তার বুক দুটো তার মুখের ওপর নেমে আসছিল আর উঁচু হয়ে উঠছিল, আর পেটের নিচে ভেজা রেখাটা তার নিজের উরুতে গড়িয়ে পড়ছিল। কুড়ি ঠাপের ভেতরেই তিনি একবার এলেন — চুপ করে, শুধু পায়ের আঙুল গুটিয়ে।
শর্মিষ্ঠা- আর।
রুদ্র- এখন?
শর্মিষ্ঠা- পিছন ফিরে।
তিনি পালঙ্কের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত দিয়ে কোমর ধরে রাখলেন, আর এবারে ঠাপগুলো লম্বা হলো। তিনি মাথা নিচু করে রইলেন, শুধু একবার বললেন।
শর্মিষ্ঠা- আমার নাম ধরে ডাক।
রুদ্র- শর্মিষ্ঠা।
শর্মিষ্ঠা- আবার।
রুদ্র- শর্মিষ্ঠা।
দ্বিতীয়বারে তিনি এলেন আর একটা লম্বা কাঁপুনি দিয়ে, তারপরই দুই হাতে বিছানার চাদর খামচে ধরে ধসে পড়লেন।
রুদ্র তার পিঠে হাত রাখল, আর শর্মিষ্ঠা কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস নিলেন। তারপর উঠে বসে নিজের কাপড়টা টেনে নিলেন, আর ঠিক যেন কোনো কিছুই হয়নি, চুলটা বেঁধে ফেললেন।
শর্মিষ্ঠা- সকালে তোর মা জিজ্ঞেস করবে কোথায় ছিলি।
রুদ্র- বলব না।
শর্মিষ্ঠা- বলিস। বলিস খালার ঘরে ছিলি, খালা অসুস্থ।
শর্মিষ্ঠা- সত্যি কথা বলে ফেললে দিদি অন্য কিছু ভাববে না, কারণ দিদি জানে আমি অসুস্থ থাকলে পাশে কেউ দরকার।
শর্মিষ্ঠা- আর একটা কথা — তোর মা কতদিন ধরে এই বাড়ির হিসাব রাখছে, জানিস?
রুদ্র- কেন?
শর্মিষ্ঠা- কারণ খাজনার সিল আজ তোর হাতে, খাতাও তোর কাছে। এখন অন্তঃপুরের হিসাবও কারও একজনের হাতে যাবে।
শর্মিষ্ঠা- আর আমি ভাবছি, সেটা কার হওয়া উচিত।
রুদ্রসেন কিছু বলল না। দরজা খোলা রইল, আর নিচে উঠোনে কালো কুকুরটা তখনো পিছনের দেয়ালের কাছে বসে ছিল।
সকালবেলা রানিমার ঘরে ভাই-বোনের হিসাব বসতে আর দেরি লাগল না। ভবানী দেবী আজ মাথায় তেল দিয়েছেন, আঁচল ঠিক করে চেপেছেন, আর হাতে পিতলের থালায় খাজনার খাতাটা রেখেছেন।
শর্মিষ্ঠা পায়ে হাঁটার মতো করে ঢুকলেন — নিজের ঘর হলে যেভাবে ঢোকা হয়।
শর্মিষ্ঠা- দিদি, খাতাটা আমার হাতে দে।
ভবানী- কেন?
শর্মিষ্ঠা- কারণ এই বাড়িতে এখন তিনজন হিসাব রাখে — তুই, তোর ছেলে, আর একটা খাতা। মন্ত্রী নেই। একজন কম।
ভবানী- তুই তো এই বাড়ির মেয়ে ছিলি না, তুই গিয়েছিলি।
শর্মিষ্ঠা- যাইনি। আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। পার্থক্যটা তোর ছেলে বুঝে গেছে, তুই বুঝিস নি।
ভবানী দেবী থালাটা বিছানার ওপর নামিয়ে রাখলেন, আর তার কাচের চুড়ি একবার বাজল।
ভবানী- তুই কী চাস?
শর্মিষ্ঠা- অন্তঃপুরের খাতা। শুধু খাতা — রানিমার নামটা আমার নামের পাশে থাকবে।
ভবানী- আর আমি?
শর্মিষ্ঠা- তুই থাকবি রানিমা। তোর জায়গা কেউ নিতে চায় না। কিন্তু এই বাড়ির প্রতিটা দরজা কত রাতে কতবার খোলে — সেই লেখাটা আজ থেকে আমার হাতে।
ভবানী- আর তোর মেয়ে?
শর্মিষ্ঠা- তপতী? ও কিছু চায় না। ও শুধু দেখে।
একটু দূরে জানালার পাশে বসে ছিল তপতী, আর সত্যি সত্যিই সে কিছুই চাইছিল না — সে শুধু মায়ের আর দিদির মুখের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল, আর নিজের মনে একটা হিসাব কষছিল।
ভবানী অনেকক্ষণ কিছু বললেন না। তারপর একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আর সেটা আর রাজনীতি ছিল না।
ভবানী- জানিস, শর্মিষ্ঠা? এই খাতা রাখা সহজ কাজ নয়।
শর্মিষ্ঠা- আমি তোকে ডিমের দাম জিজ্ঞেস করছি না, দিদি।
ভবানী- তুই এই খাতা রাখলে তুই জানবি কে কার ঘরে যায়। আর সেটা জানলেই তুই রাজবাড়ির সবচেয়ে ভিতরের মেয়ে হয়ে যা।
শর্মিষ্ঠা- আর সেটাই আমার কাজ।
ভবানী দেবী হাত বাড়িয়ে খাতাটা তুলে নিয়ে শর্মিষ্ঠার দিকে এগিয়ে দিলেন, আর হাতটা মাঝপথে একবার কেঁপে গেল।
ভবানী- কাছে আয়।
শর্মিষ্ঠা কাছে গেল। ভবানী তার কানে কানে বললেন, ছোট গলায়।
ভবানী- রাতে দরজা খোলা থাকলে যোগফল ঠিক থাকে না। তুই যোগফল রাখ, কিন্তু তার আগে জানিস — এই বাড়ির ভিতরে যে যা চায়, তার সবটাই তার ছেলের ঘরে।
শর্মিষ্ঠা- জানি, দিদি। জানি বলেই খাতাটা চাইছি।
তারপরই কেউ দরজায় টোকা দিল। ভজু মাথা ঢুকিয়ে বলল, আর তার গলা একটু অন্যদিনের চেয়ে শুকনো।
ভজু- রানিমা, দূত ফিরে এসেছেন।
ভবানী- কাল তো গেলেন।
ভজু- না। নৌকো ঘাট ছেড়ে দিয়ে ফিরে এসেছে। ভৈরবগড় থেকে খবর এসেছে।
ভজু- ভৈরবগড়ের রাজার বোন মরে গেছেন। বিয়ের আগেই।
ভজু- তাই সন্ধির শর্তটা বদলে গেছে। এখন তারা বিয়ের জন্য মেয়ে চাইছে না।
ভজু- তারা এখন যুবরাজ নিজে যেতে বলেছে। অতিথি হিসাবে, তিন মাসের জন্য।
ঘরে চুপ। ভবানী দেবীর হাতের থালাটা বিছানার ওপর পড়ে রইল, আর শর্মিষ্ঠার হাতে খাতাটা চাপা রইল।
শর্মিষ্ঠা- তিন মাস।
ভবানী- তুই কী বলছিস?
শর্মিষ্ঠা- বলছি, ভৈরবগড় একটা বিয়ের দরজা বন্ধ করেছে, আর একটা যুদ্ধের দরজা খুলেছে। আর এই বাড়িতে এখন সিলটা তোর ছেলের হাতে।
ভবানী- তাহলে?
শর্মিষ্ঠা- তাহলে এখন ঠিক করার সময় — কে এই বাড়িতে থাকবে, আর কে বাইরে পড়ে থাকবে।
দরজার বাইরে তখন চন্দ্রলেখা এসে দাঁড়ালেন, আর হাতে পানের বাটা। তিনি খাতাটা শর্মিষ্ঠার হাতে দেখে কিছু বললেন না। শুধু একবার ঘরের দিকে তাকালেন, তারপর ছোট গলায় বললেন।
চন্দ্রলেখা- এখন কেউ আমাকে একটা সত্যি কথা বলবে?
চন্দ্রলেখা- রুদ্রসেন বাইরে গেলে এই বাড়ির হিসাব কে রাখবে?
ভবানী দেবী থালাটা তুলে নিলেন, আর খাতাটা নিজের হাতে নিয়ে আবার শর্মিষ্ঠার হাতে দিলেন — এবার আর কাঁপল না।
ভবানী- রাখব আমরা দুই বোন।
ভবানী- মেয়েরা সব থাকবে। ছেলে বাইরে থাকবে।
ঠিক তখনই দরজায় রুদ্রসেন এল। সে ভিতরে ঢুকল, আর ঘরে দুই বোন — একজন হাতে খাতা, একজন হাতে থালা। কেউ উঠল না।
ভবানী- রুদ্রসেন, তুই কাল রাতে খালার ঘরে ছিলি?
রুদ্র- ছিলাম।
ভবানী- কেন?
শর্মিষ্ঠা- কারণ আমি অসুস্থ ছিলাম, দিদি।
ভবানী তার বোনের দিকে তাকালেন, তারপর ছেলের দিকে। তিনি কিছু বললেন না, শুধু থালাটা বিছানার ওপর নামিয়ে রাখলেন, আর নিজের হাতটা একবার আঁচলের ভিতরে ঢুকিয়ে নিলেন।
ভবানী- আজ রাতে আমার ঘরে আয়।
রুদ্র- খালা তো আছেন।
শর্মিষ্ঠা- খালা আছে। কিন্তু খালার ঘরে আর দরকার নেই — খালা তার দাম নিয়ে নিয়েছে।
শর্মিষ্ঠা- তবে একটা কথা, রুদ্রসেন। এই খাতাটা আমি রাখব, আর আমি রাখলে ওতে তোর নামের পাশে সব নাম থাকবে। সেটা ভুলিস না।
ভবানী- শর্মিষ্ঠা।
শর্মিষ্ঠা- বলছি, দিদি। এখন ও তোর ডাকে যাক।
আর সেই সকালে, পশ্চিমের সিঁড়ির ওপরে, চন্দ্রলেখা খাতাটা নিজে চেয়ে পড়লেন একটা কাজের জন্য — কারণ এই বাড়িতে একটা মেয়ে আছে, যার নাম আজ আর কারও খাতায় নেই, আর তার একটা ঠিকানা দরকার।