নৌকো ছাড়ল ভোরে, যখন নদীর ওপর কুয়াশা এত মোটা যে ঘাটের সিঁড়িও দেখা যায় না। ছ'জন মাঝি, দুইজন দূত, তপতী, আর রুদ্রসেন — মোট দশ জন, আর একটা কাঠের বাক্সে খাতা।
ভজু ঘাটে দাঁড়িয়ে রইল, কারণ মন্ত্রী ঘর ছেড়ে যেতে পারে না। সে শুধু হাত তুলল, আর রুদ্র পিছনে তাকাল না।
দুই ঘণ্টা পর কুয়াশা কাটল, আর নদীটা দেখা গেল — চওড়া, ধূসর, আর দুই পাড়ে বাঁশের ঝাড়। তপতী নৌকোর সামনের দিকে বসে ছিল, হাতে একটা ছোট পিতলের গেলাস, আর সে দুই ঘণ্টা ধরে একই দিকে তাকিয়ে ছিল।
রুদ্র- কী দেখছিস?
তপতী- পিছনের নৌকোটা।
রুদ্র- পিছনে নৌকো আছে?
তপতী- আছে। দুপুরে একটা বাঁকে আমরা একবার ভেড় করেছিলাম, আর ওখান থেকে ওটা আমাদের সঙ্গেই আছে।
তপতী- সাদা পাল, একটা মাস্তুল, আর তিনজন মাঝি। ছোট নৌকো, তাই আমাদের ধরতে পারে না। কিন্তু আমাদের ছাড়তেও পারছে না।
রুদ্র একবার পিছনে তাকাল। নদীটা তখন রোদে ঝিকমিক করছে, আর দূরে সত্যিই একটা সাদা পাল দেখা যাচ্ছে — ছোট, স্থির, ঠিক যেন কেউ অপেক্ষা করছে।
রুদ্র- দূত।
দূত- যুবরাজ।
রুদ্র- পিছনের নৌকোটা কার?
দূত- আমার রাজ্যের নয়।
রুদ্র- আর?
দূত- আর আমার জানা উচিত ছিল, যুবরাজ। দুঃখিত।
সন্ধ্যায় নৌকো ভেড় করল একটা বাঁশের ঘাটে, আর মাঝিরা রান্নার জন্য আগুন জ্বালল। তপতী নৌকো থেকে নামল না, সে শুধু গেলাসটা ধুয়ে ফিরে এসে রুদ্রের পাশে বসল।
তপতী- কাল সকালে আমরা ভৈরবগড়ে পৌঁছব।
রুদ্র- জানিস?
তপতী- মাঝিরা বলছে। আর মাঝিরা জানে না আমি ওদের কথা শুনি।
রুদ্র- তুই এত হিসাব রাখিস কেন?
তপতী- কারণ মায়ের খাতায় প্রথম পাতায় লেখা আছে — যে হিসাব রাখে না, সে হিসাবের ভিতরে পড়ে যায়।
মাঝিরা খিচুড়ি খেতে খেতে একটা গান ধরল, নদীর গান নয়, ঘাটের গান — যেটা নৌকোয় থাকা লোক গায়, আর ঘরে স্ত্রী শোনে না। তপতী গানটা শুনল, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, আর সেটাই ছিল সারা দিনে তার একমাত্র অকারণ শব্দ।
রুদ্র- তোর বাবা কেমন ছিলেন?
তপতী- ঠান্ডা।
রুদ্র- আর তোর মা?
তপতী- ঠান্ডা না।
তপতী- মা আমার সামনে একদিন কাঁদেন নি, আর আমি একদিনও মাকে জিজ্ঞেস করিনি কেন।
রুদ্র- তুই কত বছর ছিলি ওই বাড়িতে?
তপতী- উনিশ। সবগুলো।
তারপর সে গেলাসটা নিজের কোলের ওপর রাখল, আর একটা কথা বলল যা রুদ্র আগে শোনেনি।
তপতী- যুবরাজ, আপনি ভৈরবগড়ে যা যা দেখবেন, সব খেয়াল রাখবেন। কিন্তু আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না কিছু।
রুদ্র- কেন?
তপতী- কারণ আমি এই নৌকোয় দুজনের হয়ে যাচ্ছি — মায়ের হয়ে, আর নিজের হয়ে। আর দুজনের হয়ে গেলে কেউ একজন ঠকবেই।
নদীর ওপর আলো নিভে গেল, আর আগুনের পাশে মাঝিরা খিচুড়ি খেতে বসল। রুদ্রসেন চাদরটা গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল, আর ঘুমিয়ে পড়ার আগে শেষবার যা দেখল, সেটা হলো — পিছনের অন্ধকারে সাদা পালটা এখনো আছে, আর তার ওপর একটা লাল বাতি জ্বলছে।
ভৈরবগড় সকালে প্রথম দেখা গেল পাহাড়ের গায়ে। সুবর্ণগড়ের মতো বড় নয়, আর সাদা পাথরের নয় — কালো পাথরের, ঢালু ছাদ, আর তিন দিকেই খাদ। যুদ্ধের জন্য বানানো শহর, বাণিজ্যের জন্য নয়।
ঘাটে কেউ ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল না। ঘাটে দাঁড়িয়ে ছিল আটজন সিপাহী, একজন বুড়ো সভাসদ, আর একটা বড় ছাতার নিচে একজন মেয়ে।
মেয়েটির বয়স বত্রিশের বেশি নয়, গায়ে কালো শাড়ি — বিয়ের শাড়ি নয়, শোকেরও নয়। কপালে সিঁদুর আছে, কানে সোনা, আর হাতে কোনো চুড়ি নেই।
লাল পাহাড়ের গায়ে তখন সকালের রোদ লাগছে, আর ঘাটের সিঁড়িতে দুইজন লোক দাঁড়িয়ে আছে — একজন যুবরাজ, একজন পলাতক মন্ত্রী। আর নদীর ওপার থেকে একটা সাদা পাল সরে যাচ্ছে, কাজ শেষ।
ভৈরবগড়ের রানির ঘর গোটা রাজবাড়ির সবচেয়ে উঁচুতে, আর সবচেয়ে ঠান্ডায়। জানালায় কাচ নেই, শুধু কাঠের ঝরোখা — খুললে নিচে সমতল খাদ দেখা যায়, আর বন্ধ করলে ঘরটা একটা পোড়ামাটির পাত্রের মতো নীরব হয়ে যায়।
রুদ্রসেন সন্ধ্যায় ডাক পেয়ে এল, আর ভিতরে দুইটা প্রদীপ জ্বলছিল, পুঁইমাচা, নকশি কাঁথা, আর মেঝেতে গালিচা। ইলা ঝরোখার পাশে বসে ছিল, আর সামনে রাখা ছিল একটা ছোট টেবিল — যার ওপর একটা কাপড়ে মোড়া জিনিস।
ইলা- দরজা লাগান।
রুদ্র- আপনার সভাসদ?
ইলা- বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, আর আমি ওকে জিজ্ঞেস করিনি।
রুদ্র কাপড়ে মোড়া জিনিসটার দিকে তাকাল।
রুদ্র- এটা কী?
ইলা- আপনার রাজার খাতা।
রুদ্র- আপনি খুলেছেন?
ইলা- খুলি নি। চাবিটা ওর কাছেই আছে, আর ও এখনো ভাবে আমি ওকে ব্যবহার করছি।
ইলা- ওর একটা বদভ্যাস আছে, যুবরাজ। ও ভয় পায় না, ও শুধু হিসাব করে। আর হিসাবি লোকদের হাত সবসময় খালি থাকে — তাই হাত থেকে পড়েও যায় অনেকে।
রুদ্র- আপনি আমাকে ডেকেছেন কেন?
ইলা- কারণ আমার স্বামীর বয়স কুড়ি, আর সে এই তিন মাস ধরে খাট থেকে নামতে পারে না। আমি সাত বছর ধরে এই রাজ্যের সব কাজ করি, কিন্তু যেদিন সে যাবে, সেদিন এই সিঁড়িতে কারও রক্ত বইবে — ভৈরবগড়ে উত্তরাধিকারের নিয়মটা খারাপ।
রুদ্র- আপনার কোনো ছেলে নেই?
ইলা- নেই।
রুদ্র- তাহলে?
ইলা- তাহলে একটা ছেলে দরকার।
ঘরটা চুপ হয়ে গেল, আর ঠিক সেই চুপের ভিতরে রুদ্রসেন বুঝে ফেললেন — এই নারী তাঁকে জিজ্ঞেস করছেন না, তিনি বেছে নিচ্ছেন।
ইলা- আপনি ভয় পেলেন না?
রুদ্র- পেলাম।
ইলা- ভালো। ভয় পায় না যে লোক, তার সাথে আমি বসতে রাজি নই।
সে উঠে দাঁড়াল, তারপর ঝরোখাটা বন্ধ করে দিল, আর ঘরটা পোড়ামাটির মতো নীরব হয়ে গেল।
ইলা- আমার শরীরে এই সাত বছরে কেউ হাত দেয়নি, যুবরাজ। স্বামী রোগী, আর এই বাড়ির সভাসদরা স্বামীর বয়স দেখে এত ভয় পায় যে তারা আমার দিকে তাকাতেও ভয় পায়।
ইলা- আজ রাতে একবার তাকান।
রুদ্র উঠে দাঁড়ালেন, আর তার কাছাকাছি গেলেন। ইলা নিজে তার হাত ধরে নিজের কাঁধে রাখলেন, তারপর সেটা বুকের দিকে নামিয়ে নিলেন। তার শরীর টান, শুকনো, কিন্তু ভারী — আর নিচের পেটে সাত বছরের কোনো নরম ভাঁজ নেই, যেন শরীরটা নিজেই হিসাব মিলিয়ে সরু হয়ে গেছে।
ইলা- কাপড়টা খুলুন।
রুদ্র- আপনি?
ইলা- আমি পারব না। আজ আমার হাত কাঁপবে।
তিনি নিজে হাত দিয়ে তাকে খুললেন, আর ইলা চোখ বন্ধ করে রইল, তারপর একটা লম্বা শ্বাস ফেলল, যেন অনেক দিনের জমা শ্বাস।
ইলা- ইসসস। ঠিক আছে। এখন আমার ঘাড়ে ঠোঁট রাখুন।
ইলা- আর একটা কথা — আজ রাতে আমি শব্দ করব না, কারণ আমার শ্বশুরবাড়ির লোক শুনবে।
রুদ্র তার ঘাড়ে ঠোঁট রাখলেন, তারপর তাকে গালিচার ওপর শুইয়ে দিলেন। ইলার দুই হাত তার পিঠে গিয়ে পড়ল, ছোট ছোট আঙুল, আর সেই আঙুলগুলো প্রথমে কাঁপতে লাগল, তারপর স্থির হলো।
ইলা- ভিতরে… আস্তে। আমার শরীর ভুলে গেছে।
রুদ্র- ব্যথা করলে বলবেন।
ইলা- বলব না।
প্রথম ঢোকার পরেই তার চোখ দিয়ে দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল, আর তিনি হাত তুলে সেটা মুছে ফেললেন, যেন কেউ দেখে ফেলেছে।
ইলা- এই না। আমি কাঁদছি না।
রুদ্র- বললাম না।
ইলা- এখন নড়ুন।
রুদ্র ঠাপ দিতে লাগল, আর ইলা দুই হাত দিয়ে তার কাঁধ চেপে ধরলেন, মাথা পিছনে হেলিয়ে, ঠোঁট চেপে, চোখ বন্ধ — শব্দ নেই, কিন্তু তার পেটের নিচের ছোট ছোট কাঁপুনিটা শব্দের চেয়ে বেশি সত্যি।
কুড়ি ঠাপের মাথায় একটা লম্বা ওঁঠ-চাপা শব্দ বেরিয়ে গেল, আর তার দুই পা একসঙ্গে কুঁকড়ে গেল।
ইলা- আরও। আজ রাতে কোনও হিসাব নেই।
দ্বিতীয়বারে তিনি নিজেই ছোট ছোট করে উঠতে লাগলেন, আর রুদ্র তার বুকটা দুই হাতে চেপে ধরে তাল মিলিয়ে চলল। ইলা দুইবার এলেন, দুইবারই চোখ বুজে, আর দুইবারই কিছু বললেন না।
তারপর গালিচার ওপরেই শুয়ে রইলেন, নিঃশ্বাস নিতে নিতে, আর হাতটা রুদ্রের বুকের ওপর।
ইলা- কাল সকালে আমার স্বামী আপনাকে দেখতে চাইবেন।
রুদ্র- দেখলে কী হবে?
ইলা- উনি আপনাকে দেখে বুঝে নেবেন, আমার ঘরে কে ছিল।
রুদ্র- তাহলে?
ইলা- তাহলে উনি কাঁদবেন, আর কিছু বলবেন না। কারণ উনি জানেন, তিনি বাঁচলে এই রাজ্য বাঁচে না, আর আমি বাঁচলে বাঁচে।
সে উঠে বসল, চুলটা কুছে দিয়ে বাঁধল, আর ঝরোখাটা খুলে দিল। খাদের ওপর দিয়ে বাতাস ঘরে ঢুকে দুইটা প্রদীপের শিখা একবার নাচিয়ে দিল।
ইলা- আর আপনি একটা কাজ করবেন, যুবরাজ। শিবানন্দকে আপনি ছুঁবেন না।
রুদ্র- কেন?
ইলা- কারণ ও এখনো ভাবে ও আমাকে ব্যবহার করছে, আর আমি চাই ও আরও তিন মাস ভাবুক। যে লোক নিজেকে চালক ভাবে, তার হাতেই সব দড়ি তুলে দিতে হয়।
ভৈরবগড়ের মহারাজ বীরসেন কুড়ি বছরের একটা ছেলে, আর তার ঘরটা একটা ঘর নয় — একটা দাতাখানা। পাশে রাখা ওষুধের বাটি, একটা রুপোর গেলাস, আর একটা কাঠের মেজের উপর ত্রিশ-চল্লিশটা ছোট কাগজ, যেগুলোতে সে নিজের হাতে লিখেছে।
রুদ্র ভিতরে ঢুকলে সে হাসতে গেল, আর হাসতে গিয়েই কাশতে শুরু করল। রানিমা নয় — ইলা নিজে এগিয়ে গিয়ে তার বুকে হাত রাখলেন, আর তিনি শান্ত হয়ে গেলেন।
বীরসেন- আপনি আসলেন।
রুদ্র- আপনি ডেকেছেন।
বীরসেন- আমি ডাকিনি। আমার বাবা ডেকেছিলেন, মরে যাওয়ার আগে। আমি শুধু ওই কাজটা শেষ করছি।
বীরসেন- আমার বোন মরে গেছে, আপনি জানেন?
রুদ্র- শুনেছি।
বীরসেন- ও আমার জ্যেষ্ঠা ছিল। যেদিন ও মরল, আমার জানালার ওপাশে ভৈরবগড়ের সব ঘণ্টা একসঙ্গে বাজল। আমি তখনো খাট থেকে উঠতে পারি না, তাই শুধু শুনলাম।
রুদ্র- আমার দুঃখ রইল।
বীরসেন- না রাইখেন। আমার এখন একটা কথা আছে, আপনি শুনবেন?
সে এক হাত তুলে ইলাকে ইশারা করল, আর তিনি দরজা লাগিয়ে দিলেন। তারপর ছেলেটা তার কাগজগুলোর ভিতর থেকে একটা বের করে সোজা করে ধরলেন।
বীরসেন- এইটা আমার হাতের লেখা। সন্ধির খসড়া।
রুদ্র- সন্ধির?
বীরসেন- সন্ধি কি সামনে থেকে হয়, যুবরাজ?
বীরসেন- এই কাগজে লেখা আছে, আমার রাজ্যে আপনার দুইশো সিপাহী থাকবে, আর আপনার রাজ্যে আমার দুইশো। দুইপাশে একসাথে। যাতে কেউ কোথাও চোখ বন্ধ করে ঘুমোতে না পারে।
বীরসেন- আপনার মন্ত্রী শিবানন্দ আমাকে উল্টো কাগজ বেচেছে, আর আমার নিজের মন্ত্রীও। ওরা দুজনেই ভেবেছে আমি রোগী, তাই বোকা।
ইলা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর তখন একবার বললেন, ঠান্ডা গলায়।
ইলা- ওরা দুজনেই ভেবেছে আমিই চালাই। ভালো।
বীরসেন- তুমিই তো চালাও।
ইলা- চালাই, কিন্তু কাগজে সই করি তুমি।
সন্ধ্যাবেলায় ঘণ্টা বাজল, আর দরবার-ঘরে দুই রাজ্যের সভা বসল। রুদ্র একপাশে, মন্ত্রী শিবানন্দ ঠিক তার সামনে, হাতে সেই খাতা।
শিবানন্দ- যুবরাজ, আপনি শুনে খুশি হবেন। ভৈরবগড়ের মন্ত্রী আমার সাথে একমত — সন্ধির শর্ত বদলানো দরকার।
রুদ্র- কোন শর্ত?
শিবানন্দ- আপনার বাবার সময় শেষ। তাই এখন আপনার রাজ্যের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে, যদি ভৈরবগড় আপনার অন্তঃপুরের মেয়েদের ভিতরে একটা নিজের লোক রাখে।
শিবানন্দ- অর্থাৎ, একটা বিয়ে।
ঘরে চুপ। ভৈরবগড়ের সভাসদরা একে অন্যের মুখ দেখল, আর ইলা কিন্তু কিছুই বললেন না — তিনি একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হাতের পিতলের গেলাসটা ধরে।
রুদ্র- মন্ত্রী।
শিবানন্দ- বলুন।
রুদ্র- আপনি আমার রাজ্যের খাতা এই দরবারে এনেছেন কেন?
শিবানন্দ- কারণ এই খাতা এখন আমার।
রুদ্র- সেই খাতা কার হাতে লেখা?
শিবানন্দ- আমার হাতে, এবং মহারাজের সিলে।
রুদ্র উঠে দাঁড়ালেন, তারপর খাতাটা চেয়ে নিলেন, খুলে শেষ পাতা দেখলেন, আর তারপর সেই কাগজটা দরবারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়তে শুরু করলেন — জোরে, যাতে তিন সহস্র পা দূরে ঘাটের মাঝিরাও শুনতে পায়।
রুদ্র- 'ভৈরবগড় — সোনা, ত্রিশ।' 'আনন্দবাজার — কুড়ি।' 'সরিষার খাজনা — দশ।'
রুদ্র- মন্ত্রী, আপনার হাতের লেখায় এই কাগজের সব লাইন, আর একটাও সন্ধির নয়।
শিবানন্দ দরবার ছাড়লেন না। তিনি বরং হাসলেন, আর তারপর যা বললেন সেটা রুদ্রের প্রত্যাশার বাইরে ছিল।
শিবানন্দ- ঠিক বলেছেন। সন্ধি নয়। ব্যবসা।
শিবানন্দ- আর আপনি ভাবছেন ব্যবসাটা আমি করেছি? যুবরাজ, আপনার রাজ্যের খাজনা, আপনার অন্তঃপুরের খাতা, আপনার সিঁড়ির ভাঙা ধাপ — আমি সব জেনেছি কারণ আমি রাজবাড়ির সবচেয়ে কম পাওয়া লোক ছিলাম।
শিবানন্দ- কিন্তু সোনা টাকাটা আমার কাছে আসেনি। ও এসেছে আপনার মায়ের ঘরে।
দরবার-ঘরে যে চুপটা নামল, সেটা আর চুপ নয় — সেটা একটা পাথরের মতো ভারী হয়ে ঘরের সবাইকে চেপে ধরল।
রুদ্র কিছু বললেন না, আর ইলা সেই চুপটাই ব্যবহার করলেন।
ইলা- মন্ত্রী, আপনার কথা শুনলাম। এখন আমার কথা শুনুন।
ইলা- এই খাতা ভৈরবগড়ে এসেছে একটা ভাড়া করা নৌকোয়, আপনার হাতে। আপনার যুবরাজ আসার আগের রাতে। মানে তিন দিন আগে আপনি জানতেন তিনি আসছেন।
ইলা- অর্থাৎ আপনি তথ্য বেচছেন দুইদিকেই, আর দাম নিচ্ছেন দুইবার।
ইলা- আমার রাজ্যে তথ্য বেচা অপরাধ নয়। কিন্তু দ্বিগুণ দাম নেওয়া অপরাধ।
ইলা- সিপাহী।
দুইজন সিপাহী ভিতরে এল, আর শিবানন্দ ভজুর কথা বলতে গেলেন, তারপর থেমে গেলেন — কারণ ভজু সুবর্ণগড়ে, আর এখানে কেউ তার কথা শুনবে না।
রুদ্র- আপনি বেঁচে যাবেন, মন্ত্রী।
শিবানন্দ- কেন?
রুদ্র- কারণ আপনার ভিতরে আমি আমার বাবার ঘরের একটা লাইন খুঁজে পাব, যেটা আর কেউ জানে না।
রুদ্র- এখন যান। আর কাল সকালে আপনি আমার ঘরে আসবেন, খাতা হাতে, আর একটা প্রশ্নের উত্তর হাতে — আমার মায়ের ঘরে সোনাটা কে নিয়েছে, আর কে পৌঁছে দিয়েছে।
সভা ভাঙল। আর ঠিক সেই সময়ে, দুজন না, তিনজন লোক দরবারের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। একজন ইলা, একজন ইলার সভাসদ — আর একজন তপতী, হাতে একটা ছোট পিতলের গেলাস, যেটা সে আজ সকালে ভৈরবগড়ের ঘাটে কেনা হয়েছে।
তপতী রুদ্রের দিকে তাকাল, আর তার মুখে কোনো ভাবই ছিল না।
তপতী- যুবরাজ। কাল সন্ধ্যায় আমাকে নৌকোয় নিয়ে যাবেন না। আমি এখানে থাকব।
রুদ্র- কেন?
তপতী- কারণ এই শহরে আমার বয়সের কেউ নেই, আর আপনার মতো কেউও নেই।
তপতী- আমার একটা নাম দরকার, যেটা মায়ের খাতায় লেখা থাকবে না।
সেই রাতে ভৈরবগড়ের ঘাটে একটা চিঠি এল সুবর্ণগড় থেকে, একটা দ্রুত ডাকের ঘোড়ায়। চিঠিটা ভজুর হাতের লেখা, আর তাতে মাত্র এক লাইন।
'যুবরাজ, দিদিমণি ফিরে এসেছেন।'
রুদ্রসেন কাগজটা দুইবার পড়ল, তারপর জানালার কাছে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করলেন।
মৃণালিনী। এই বাড়ির বড় মেয়ে। যে সাত বছর আগে বিয়ে করে গিয়েছিলেন, আর তারপর আর একবারও আসেন নি।