ইলা চিঠিটা আগে পড়েছিলেন, নিজের হাতে খুলে — কারণ ভৈরবগড়ে কোনো চিঠি রাজার সামনে না গিয়ে রানির সামনে যায়।
ইলা- আপনার দিদিমণি ফিরে এসেছেন।
রুদ্র- আমি জানি।
ইলা- আর আপনি এখনই যাবেন।
রুদ্র- যাব।
তিনি চিঠিটা গুছিয়ে ভাঁজ করলেন, তারপর নিজের কাঁচের বাক্সে রেখে দিলেন — যেখানে তিনি কাগজ রাখেন, সেখানে নয়।
ইলা- তিন মাসের হিসাব এক মাসে শেষ হলো না।
রুদ্র- না।
ইলা- তাহলে বাকিটা আমি রাখলাম।
রুদ্র- কী হিসাবে?
ইলা- ফেরার হিসাবে। যে লোক একটা কথা শুনে সোজা ঘরে ছোটে, সে একদিন আবার ছুটবে। আমি অপেক্ষা করতে জানি, যুবরাজ। আমি সাত বছর অপেক্ষা করেছি।
নৌকো ছাড়ল সেদিন বেলা তিনটেয়, আর এবার পিছনে কোনো সাদা পাল ছিল না। শিবানন্দ ভৈরবগড়ে রয়ে গেলেন — ইলার শর্তে, আর ইলার জেলে নয়; ইলার কাজে।
তপতী যাত্রীর তালিকায় নাম লিখল না।
তপতী- আমি থাকব।
রুদ্র- কেন?
তপতী- কারণ এই নৌকো সুবর্ণগড়ে ফিরছে, আর আমি তিন মাস আগেই সেখান থেকে বেরিয়েছি।
তপতী- আমি নিজের নাম নিজে লিখেছিলাম। এখন নিজের ঠিকানা নিজে ঠিক করব।
রুদ্র- শর্মিষ্ঠা রাগ করবেন।
তপতী- মা রাগ করলে রাজনীতি হয় না, মা রাগ করে লিখে রাখেন। সেটাই আমার দরকার।
ফেরার পথে তিন দিন লেগে গেল, কারণ নদীর জল নামছিল। চতুর্থ রাতে সুবর্ণগড়ের ঘাট দেখা গেল, আর রুদ্রসেন দেখতে পেলেন — ঘাটে কেউ দাঁড়িয়ে নেই।
মাস দেড়েক আগে যেদিন তিনি গিয়েছিলেন, সেদিনও কেউ দাঁড়িয়ে ছিল না। কিন্তু সেদিন আর আজকের ফারাকটা হলো — আজ ঘাটের বাতিগুলো নিভানো, আর সিঁড়ির দুই পাশে দুইজন পাহারাদার।
পাহারাদার- যুবরাজ।
রুদ্র- কে পাঠিয়েছে?
পাহারাদার- ভিতরের নিয়ম।
উঠোনে ঢুকতেই রুদ্রসেন থমকে দাঁড়ালেন। কারণ এই উঠোনটা তিনি চেনেন না।
একদিকে রান্নাঘরের দরজায় কয়েকটা হাঁড়ি সাজানো, যেটা কেউ আসলে সাজায় না। আর অন্যদিকে — বাঁ দিকের সেই পুরনো আমলকী গাছটার নিচে একটা কাঠের কেদারা বসানো, আর কেদারার পাশে একটা ছোট টেবিল। উঠোনে বসবার ব্যবস্থা এক বছর ধরে কেউ করেনি।
আর দরবার-ঘরের দরজা খোলা। রাত দেড়টায়।
রুদ্র ভিতরে ঢুকলেন, আর দেখলেন — প্রদীপের আলোয়, রুদ্রের নিজের চেয়ারটায় বসে আছে নন্দিনী, হাতে একটা খাতা।
নন্দিনী- দেরি হয়ে গেল, ভাই।
রুদ্র- এই চেয়ারে কেউ বসে না।
নন্দিনী- হুম। এখন বসে।
নন্দিনী- তুই চল্লিশ দিন বাইরে ছিলি। এই চল্লিশ দিনে এই বাড়ির চাবি কেউ চায়নি, কেউ লুকিয়ে খায়নি, আর কেউ পশ্চিমের সিঁড়িতে রাত কাটায়নি।
নন্দিনী- এটা আমার কাজ। কারণ তুই আমাকে বলেনিস নি, কিন্তু আমাকে বাড়ি আগলে রাখতে বলেছিলি। আর ওই কাগজেই আমার কথা লেখা আছে।
রুদ্র- কাগজে কার কথা লেখা আছে?
নন্দিনী- তোর। আয়, দেখ।
সে খাতাটা এগিয়ে দিল, আর রুদ্র পড়লেন তার বাবার হাতের লেখা — মহারাজ সিল রুদ্রের নামে লিখেছেন, আর তার নিচে একটা বাড়তি লাইন, যে লাইনটা তিনি নিজে চোখের সামনে দেখেননি:
'আর আমার ভাইয়ের মেয়ে নন্দিনী, যার নাম কেউ ঘরে রাখতে রাজি ছিল না — সে এই বাড়ির ভিতরের দরজার হিসাব রাখবে, যতদিন আমার ছেলে বাইরে।'
রুদ্র কাগজটা নামিয়ে রাখলেন, আর তারপর প্রথমবার এই ফিরে আসায় তিনি হাসলেন।
রুদ্র- তুই ঠিক করেছিস?
নন্দিনী- আমি কিছু করি নি। আমি শুধু প্রতিদিন খাতা খুলেছি, আর মহারাজ প্রতিদিন সই করেছেন।
নন্দিনী- ভাই, একটা কথা — তোর দিদিমণি ভিতরে আছে, পশ্চিমের সিঁড়ির ঘরে।
রুদ্র- চন্দ্রলেখার ঘরে?
নন্দিনী- না। সেটা তিনি ছেড়ে দিয়েছেন।
নন্দিনী খাতাটা বন্ধ করল, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ারটা ছেড়ে দিল — কারণ সেটা তার নয়, সেটা সে কেবল আগলে রেখেছিল।
নন্দিনী- একটা বাড়তি খবর। তোর দিদিমণি একা আসে নি। সঙ্গে একটা সিন্দুক এনেছেন, আর সিন্দুকে তালা নেই।
নন্দিনী- খুলে দেখা হয়েছে। ভিতরে সোনা আছে, ভাই। অনেক সোনা।
উঠোনে তখন বাতাস বইছিল, আর রান্নাঘরের দরজার হাঁড়িগুলো একবার ঠনঠন করে বেজে উঠল।
দরবার থেকে বেরোতেই সিঁড়ির মুখে পদ্মা দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে একটা মাটির প্রদীপ, আর মুখটা আগের মতো নয় — এখন তার চোখে একটা হিসাব আছে, যেটা কলসী বওয়ার দিনগুলোতে ছিল না।
পদ্মা- যুবরাজ।
রুদ্র- এই সময়ে?
পদ্মা- আমি জানতাম আপনি আজ ফিরবেন। আমি তিন দিন ধরে রোজ সন্ধ্যায় সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
রুদ্র- কেন?
পদ্মা- কারণ চল্লিশ দিনে এই বাড়িতে চারটে জিনিস বদলেছে, আর চারটেই আপনার জানা দরকার।
পদ্মা- এক, ভিতরের চাবি এখন নন্দিনী দিদিমণির কোমরে। দুই, মহারাজ দিনে দুইবার উঠে বসেন, আর প্রত্যেকবার জিজ্ঞেস করেন আপনি ফিরেছেন কি না।
রুদ্র- তিন?
পদ্মা- তিন, রানিমা আর খালামণি এখন একসঙ্গে খান না।
রুদ্র- চার?
পদ্মা- চার, তপতী দিদিমণি আপনাকে ছাড়া গেছেন, আর চন্দ্রলেখা রানি সেই খবরটা শুনে একবার হেসেছিলেন — শুকনো, ঠান্ডা হাসি।
রুদ্র কিছু বললেন না। পদ্মা প্রদীপটা কুলুঙ্গিতে রেখে দিল, তারপর নিজে একধাপ নিচে নেমে দাঁড়াল — যেন সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কথা বলার অধিকার সে নিজের জন্য কিনে নিয়েছে।
পদ্মা- আর একটা কথা, যুবরাজ।
রুদ্র- বল।
পদ্মা- আপনার জন্য একজনের অপেক্ষা শেষ হয়নি।
রুদ্র- কার?
পদ্মা- আপনার।
পশ্চিমের সিঁড়ির ওপরে যে ঘরটা, সেটা তিন কুড়ি বছর ধরে তালাবন্ধ ছিল — কারণ ওটা মহারাজের বোনের ঘর, আর সেই বোন ভৈরবগড়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার পর আর ফেরেননি। চন্দ্রলেখা ওই ঘরে এক বছর ছিলেন, তারপর নিচের দিকে সরে গেছেন।
রুদ্রসেন দরজায় টোকা দিলেন।
ভিতর থেকে গলা এল — শুকনো, ক্লান্ত, কিন্তু পরিচিত।
মৃণালিনী- ভাই।
দরজা খুলল, আর সাত বছর পরে রুদ্রসেন তার দিদিমণিকে দেখলেন।
তিনি লম্বা নন, বরং ছোট — রুদ্রের কাঁধ অবধি। চুল নিতে ভিজে, আঁচলে জড়ানো। শাড়িটার রং বিবর্ণ, কাপড়টার এক ধার ভালো আর এক ধার পুরনো — যেই শাড়ি পরা হয় তখন, যখন ঠিক করা যায় না আজ ঘরে থাকা হবে না বাইরে। আর তার চোখের নিচে কালি, ঘুমের নয়, ভাঙনের।
মৃণালিনী- সাত বছর।
রুদ্র- দিদিমণি।
মৃণালিনী- আর এর মধ্যে একটা করে গেছেন, একটা হয়ে গেছেন।
মৃণালিনী- আমার স্বামী সংসার ছেড়েছেন, আর সংসার আমাকে ছাড়ে নি। তাই চলে এলাম।
তিনি ভিতরে সরে দাঁড়ালেন, আর রুদ্রসেন ঘরে ঢুকলেন।
ঘরটা কঠিন আর ফাঁকা, আর মেঝেতে একটা সিন্দুক রাখা — তালা নেই, ঢাকনা বন্ধ।
মৃণালিনী- দেখ।
রুদ্র- আগে কথা বলি।
মৃণালিনী- আগে দেখ, তারপর কথা।
তিনি ঢাকনাটা খুললেন, আর প্রদীপের আলোয় দেখা গেল — সিন্দুকে ভাঁজ করা শাড়ি, কয়েকটা মুঠো মুড়ি-মিঠাই, আর নিচে, একটা কাপড়ের পুঁটলিতে, সিকি-আধুলির ছোট ছোট মুদ্রা। কোনো গহনা নেই, কোনো সোনা নেই।
রুদ্র- নন্দিনী বলল একটা সিন্দুকে সোনা আছে।
মৃণালিনী- নন্দিনী ঠিকই বলেছে। আমার এই সিন্দুকে সোনা আছে, ভাই — গলায় পরার সোনা নেই, কারণ এই ঘরের পোড়া মাটিতে সোনা বেঁচে থাকে না।
মৃণালিনী- সাত বছর সেই সোনা আমার কাছেই ছিল। গলায় পরিনি, গলিয়ে দিইনি, খরচ করিনি। রাখা আর খরচ না করার মধ্যে আমার পুরো বিয়ের জীবন কেটে গেছে।
সে সিন্দুকের ঢাকনা বন্ধ করল, তারপর দেওয়ালের পাশে বসে চুলের বিনুনি খুলে ফেলল, আর চুলটা পিঠের ওপর পড়ে গেল। তার কাঁধের গোড়ায় ছোট একটা দাগ, উনুনে পোড়া, যেটা মামার বাড়ির রান্নাঘরের।
মৃণালিনী- কিছু বল না। কত বছর পর কেউ আমার ঘরে এসেছে, আর বসে রইল।
রুদ্র- বসলে কী হবে?
মৃণালিনী- দরজাটা লাগা, দরজাটা লাগলে কেউ আসবে না।
রুদ্র উঠে দরজাটা লাগালেন, তারপর ফিরে এসে তার পাশে বসলেন। মৃণালিনী হাসল, ছোট করে, এবং তারপর নিজে তার হাত ধরে নিজের কপালে রাখলেন — যেন সেটা কোনো আলো, যা দূর থেকে আসে না, তাই পাশ থেকে লাগাতে হয়।
মৃণালিনী- মা আজ রাতে ডাকেননি?
রুদ্র- ডাকেননি।
মৃণালিনী- কারণ মা জানেন আমি এসেছি।
মৃণালিনী- সাত বছর ধরে লোক পাঠিয়েছেন, লোক চিঠি নিয়ে ফিরেছে। আর আজ আমি ফিরলাম, আর মা ডাকলেন না।
মৃণালিনী- ওটা হিসাব, ভাই। মা হিসাব আর থামায় না।
তারপর সে রুদ্রের হাতটা নিজের কাঁধ থেকে বুকের দিকে নামিয়ে নিল, আর একটা শ্বাস বেরিয়ে গেল তার গলা দিয়ে — একটা লম্বা শ্বাস, যেটা সাত বছরের জমা।
মৃণালিনী- তোর হাত ভারী।
রুদ্র- দিদিমণি।
মৃণালিনী- ডাক না এই নামে। আজ রাতে এই নামটা আমার গলার কাছে যায় না।
রুদ্র তার কাঁধে ঠোঁট রাখলেন, আর মৃণালিনী তার মাথার পিছনে হাত রাখলেন — শক্ত, কস করে, ঠিক যেমন হাত রাখে সে যে জন ছেড়ে দিতে চায় না।
মৃণালিনী- সাত বছর আমি কারও ঘরে ছিলাম, ভাই। কারও মেয়ে ছিলাম, কারও বউ, কারও পুত্রবধু। কারও ছিলাম?
মৃণালিনী- আজ রাতে যেন কেউ আমার হয়।
রুদ্র তার শাড়ির আঁচল সরাতে লাগলেন, আর মৃণালিনী নিজের হাতে শাড়ির গিঁট খুলে দিলেন। তার শরীর ভরাট, কিন্তু শক্তির চেয়ে বেশি ক্লান্ত — ভারী বুক, ঠাণ্ডা পেট, আর দুই মাসে রোগা হয়ে যাওয়া কোমর। বুকের নিচে বাঁ দিকের কোণে একটা দাগ, সাত বছরের আঁচলে ঘষা, যেটা প্রায় লুকিয়ে গেছে।
মৃণালিনী- ইস। বাতাস লাগছে।
মৃণালিনী- আস্তে। আমি ভুলে গেছি এটা কেমন হয়।
প্রথম ঢোকার পরেই তার দুই হাত রুদ্রের পিঠে গিয়ে পড়ল, আর তার দুই পায়ের আঙুল খাটের কাঠ খামচে ধরল। অকথ্য এক শব্দ বেরিয়ে গেল তার গলার ভিতর থেকে, সেটা আনন্দের শব্দ নয়, প্রায় কষ্টের — যেন শরীরটা অনেকদিন পরে কাজ পেল, আর সেটা সহ্য করতে পারছে না।
মৃণালিনী- থামো না। আমি কষ্টে কাঁদলেও থামবে না।
রুদ্র- কেন কাঁদছ?
মৃণালিনী- আনন্দে। মুর্খ, আনন্দে।
রুদ্র ঠাপ দিতে লাগলেন, আর মৃণালিনী দুই হাতে তার মুখটা ধরে রাখলেন, চোখ খুলে, পুরো সময় চোখ খুলে — যেন দেখতে চান কে করছে।
শেষে তার দুই পা একসঙ্গে কুঁকড়ে এলো, আর তিনি পাশে গড়িয়ে পড়লেন, চুল ছড়ানো, নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে হাসতে লাগলেন, আর সেই হাসির ভিতরে জলও ছিল।
মৃণালিনী- শোনো। কাল সকালে সভা হবে।
রুদ্র- জানে।
মৃণালিনী- আর সেই সভায় ভজু একটা হিসাব দেখাবেন — রাজকোষ থেকে সোনা গেছে সাত বছরে, আর ঠিক সাত বছরে আমার ঘরের হিসাব মিলছে।
রুদ্র- তুই সোনা নিয়েছিস?
মৃণালিনী- না। আমি সোনা পেয়েছি।
মৃণালিনী- কিন্তু যে পাঠিয়েছে, সে আমার বাপ। আর তুই একবারও ভাবিস নি কেন আমার বাপ সাত বছর ধরে তোর কাছ থেকে সেটা লুকিয়ে রাখল?
সকালে সভা বসল দরবার-ঘরেই, আর এবার যিনি সভা চালালেন তিনি রানিমা নন — ভজু। মন্ত্রীর আসন তার, খাতা তার, আর গলাটাও এখন তার।
ভজু- যুবরাজ, আমি একটা হিসাব পড়ব।
রুদ্র- পড়।
ভজু তার খাতা খুলে পড়তে শুরু করলেন, আর ঢাকায় বসে থাকা লোকেরা হিসাব শুনতে শুনতে কেবল নিঃশ্বাস ফেলতে লাগল।
ভজু- সাত বছরে রাজকোষ থেকে সোনা ছেড়ে দেওয়ার তিনটে ফর্দ আছে। এক, বিয়ের দান — দুইশো তোলা। দুই, ভৈরবগড়ে পাঠানো উপহার — একশো তোলা। তিন, জমিদারি-সেলামি।
ভজু- কিন্তু ফর্দে লেখা আছে দানদির সিলমোহর মহারাজের, আর যুবরাজ — আপনাকে একদিনও জানানো হয়নি।
দরবারে চুপ। ভবানী একপাশে বসা ছিলেন, হাতে পিতলের একটা পানের বাটা, আর তার মুখে কোনো ভাবই নেই।
ভজু- আর চতুর্থ ফর্দ আছে, যেটা এই সাত বছরে কেউ খাতে ওঠায়নি, কারণ ওটা খাতে ওঠালে হাতে লাগে।
ভজু- 'ঘরের খবর — মাসিক দশ তোলা'। সাত বছর। মোট ছশো চল্লিশ তোলা।
ভজু- আর এই টাকাটা যেত মহারাজের এক স্ত্রীর হাত ঘুরে, প্রত্যেক মাসের সাত তারিখে, এক দাসীর মারফত।
ঘরে তখন একটা শব্দ হলো না, কেবল ভজুর খাতার পাতা ওল্টানোর শব্দ।
রুদ্র- কার হাত ঘুরে?
ভজু- রানিমা ভবানী দেবীর।
ভবানী পানের বাটাটা স্থির হাতে টেবিলে রাখলেন, তারপর বললেন, শান্ত গলায়, যেন কেউ তার নাম ধরে ডেকেছে কিছু কেনার জন্য।
ভবানী- হ্যাঁ।
ভবানী- আমার হাত ঘুরে যেত।
ভবানী- আমি মহারাজের কাছে কখনো চাইনি। আমি শুধু ওই টাকাটা নিয়ে আমার মেয়ের ঘরে পাঠিয়েছি, কারণ আমার মেয়ের স্বামী সুবর্ণগড়ের জমিদারদের ঋণ নিয়ে ঘর ছেড়ে গিয়েছিলেন, আর আমার মেয়ে সেই ঘরে একা বসে ছিল।
ভবানী- আমার স্বামীকে আমি বলতে পারিনি, কারণ তিনি রাজা — আর রাজাকে বলতে গেলে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
ভবানী- সুতরাং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর আমি প্রায় সাত বছর টিকেছি।
দরবারের সবাই ভবানীর দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু চন্দ্রলেখা রানি তাকালেন না — তিনি দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, আর তার হাতের পিতলের চুড়ি স্থির।
চন্দ্রলেখা- এত সহজে?
ভবানী- সহজ? রানি, আমি সাত বছর প্রত্যেক মাসে সাত তারিখে ঘরের দরজার পিছনে দাঁড়িয়ে থেকেছি। যদি জিজ্ঞেস করা হয়, "এই টাকা কোথায় যাচ্ছে", আমি আজ সকালে কেন জানি।
ঠিক সেই সময়ে মৃণালিনীর গলা এল দরবারের দরজা থেকে — শুকনো, স্পষ্ট, আর শুধু রুদ্রের জন্য নয়, পুরো ঘরের জন্য।
মৃণালিনী- মা, আপনি টাকা পাঠিয়েছেন।
মৃণালিনী- কিন্তু টাকাটা আমার কাছে কখনো আসেনি।
ঘরে একটা শব্দ হলো, যেন কেউ সবে একটা হাঁড়ি নামিয়েছে।
মৃণালিনী- ছয়শো চল্লিশ তোলা সোনা আমার ঘরে আটশো টাকা হয়ে এসেছে, আর আমার হাতে পৌঁছেছে একফোঁটাও নয়। আমার শাশুড়ি টাকা নিয়েছেন, আমার ননদ টাকা নিয়েছেন, আমার স্বামী টাকা নিয়ে কারবার করেছেন, আর আমার হাতে পৌঁছেছে — চাল, ডাল, আর একটা পুরনো শাড়ির একটা ধার।
মৃণালিনী- আমি সাত বছর ধরে ভেবেছি মা ভুলে গেছেন, বা মা রাগ করছেন। তখন আমি তোমাদের এই রাজবাড়ির হিসাব জানতাম না।
মৃণালিনী- আজ জানলাম, মা তোমার খাতা মিলেছে। আর আমার খাতা? আমার খাতায় কোনো নাম নেই।
ভজু তার খাতা বন্ধ করলেন, আর সেই শব্দটাই সভার সবচেয়ে বড় শব্দ হলো।
রুদ্র- মা।
ভবানী- বল।
রুদ্র- টাকাটা চুরি নয়, কারণ টাকা আমার বাবার।
ভবানী- হ্যাঁ।
রুদ্র- কিন্তু টাকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত তোমার, আর সেটা আমার বাবার।
ভবানী- হ্যাঁ।
রুদ্র- তাহলে তোমার একটা সিদ্ধান্ত, যেটা সাত বছর ধরে এই রাজবাড়ির প্রত্যেকটা লোক জানে, আর আমার বাবা জানেন না — এই সিদ্ধান্তটা আজ আমার নামে লিখে দাও।
ভবানী- লিখে দেব।
রুদ্র- এবং দিদিমণির জন্য আলাদা একটা তালা-বাক্স হবে, ভিতরের খাজাঞ্চি থেকে, প্রতি মাসে।
ভবানী- হবে।
ঘরে কেউ আর কথা বলল না, কেবল নন্দিনী খাতাটা খুলে লিখতে শুরু করল — তার হাতের লেখা বাঁকা, তাড়াহুড়ো, কিন্তু সেখানে তার নাম থাকবে, কারণ তিনি চল্লিশ দিন ধরে এই ঘরে দাঁড়িয়ে আছেন আর আজ সঠিক সময়ে সঠিক লাইনটা টেনেছেন।
নন্দিনী- ভাই, হিসাব আমি লিখব। আর দুই নম্বর হিসাব — মন্ত্রী শিবানন্দের ভৈরবগড়ে পাঠানো তথ্যের দাম, সেটাও আজ থেকে খাতায় উঠবে।
রুদ্র- হ্যাঁ।
নন্দিনী- আর একটা কথা।
নন্দিনী- মহারাজ আজ সকালে জিজ্ঞেস করেছেন তুই ফিরেছিস কি না।
নন্দিনী- আমি বলেছি ফিরেছিস।
নন্দিনী- উনি বলেছেন, সন্ধ্যায় উঠে আসবেন।
সভা ভাঙল না, কিন্তু ঘরের সবাই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকালো — কারণ এই বাড়িতে রাজা একবার ঘর থেকে বেরোতে চাইলে, সেটা অশুভ নয়, সেটা শেষ।
আর ঠিক সেই সময়ে, উঠোনের বাইরের দরজায় একটা ঘোড়ার ঘণ্টা বাজল। ভজু জানালা দিয়ে দেখলেন, তারপর ফিরে এসে বললেন, আর তার গলাটা প্রথমবার কাঁপল।
ভজু- যুবরাজ, ভৈরবগড় থেকে লোক এসেছে।
ভজু- একজন সিপাহী, একটা চিঠি হাতে। আর চিঠিটা লাল মোমের সিল করা, আর সিলের ওপর রানির নাম।
ভজু- ইলা।