সিপাহীটা ভিজে ছিল, আর তার হাতে একটা বাঁশের নল — যেটা নৌকায় চিঠি বহনের নল, লোহার পাত দিয়ে মোড়া। দরবারে সে নল খুলে কাগজটা বের করল, আর তারপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, কারণ সে জানে না এই দরবারে জিনিস পড়ে দেওয়ার নিয়ম কী।
ভজু কাগজটা নিলেন, সিলটা একবার দেখলেন, তারপর রুদ্রের দিকে তাকালেন।
ভজু- যুবরাজ।
রুদ্র- পড়।
ভজু- এক, করোনেশনের দিন ভৈরবগড়ের পাঁচশো সিপাহী এই রাজবাড়ির উঠোনে দাঁড়াবে। দুই, সেই দিনই ভৈরবগড়ের রানি ইলা এই দরবারে উপস্থিত থাকবেন, এবং বিয়ের সাক্ষ্য এখানেই হবে। তিন, ভৈরবগড় কোনো উপহার চায় না, কোনো খাজনা চায় না, এবং যৌতুকের এক পয়সাও নেবে না।
দরবারে চুপ হওয়ার আগেই চন্দ্রলেখা রানি উঠে দাঁড়ালেন, হাতে পিতলের পানের বাটা।
চন্দ্রলেখা- এই প্রস্তাব সোজা।
চন্দ্রলেখা- ইলা আসবেন এই দরবারে, এই সিঁড়িতে, এই সিলের সামনে। সাত প্রজন্মের সুবর্ণগড়ের দরবারে, কালো পাথরের রাজ্যের একজন নারী।
চন্দ্রলেখা- এটা তো দান নয়, এটা তো সম্মান।
ভবানী হাতের কাচের চুড়িটা একবার ঘোরালেন, তারপর বললেন, ঠান্ডা গলায়, যেন তিনি একটা দাম জিজ্ঞেস করছেন।
ভবানী- চার নম্বরটা আপনি পড়লেন না।
ভজু- চার নম্বর নেই, রানিমা।
ভবানী- তাই বলছি।
ভবানী- যেখানে চার নম্বর নেই, সেখানে চার নম্বর থাকে।
ভজু দ্বিতীয়বার কাগজটা দেখলেন, তারপর একটা নিচু লাইন পড়লেন।
ভজু- 'মহারাজের অবর্তমানে এই সন্ধি আমার ছেলের নামে বলবৎ থাকবে।'
ভজু- 'অবর্তমানে।'
ঘরে কেউ আর কথা বলল না। কারণ কাগজটা কালি দিয়ে লেখা, কিন্তু ওই একটা শব্দে মহারাজকে ইতিমধ্যেই মেরে ফেলা হয়েছে।
লীলাবতী পিসিমা তখন নিজের আসন থেকে উঠে ভজুর হাত থেকে কাগজটা নিলেন, তারপর শুধু একটা লাইন পড়লেন, আর সেটা পড়ে তিনি হাসলেন না।
লীলাবতী- 'এবং যদি আমার প্রস্তাব গৃহীত না হয়, তাহলে ভৈরবগড় নিজের সীমান্তে তিরিশ নৌকার পাহারা বাড়াবে, কারণ ভৈরবগড়ের উত্তর সীমান্তে এখন সিপাহী আছে যারা আমাদের কেউ নয়।'
লীলাবতী- যুবরাজ, ইনি আসতে চাইছেন কারণ তিনি ভয় পেয়েছেন। ভৈরবগড়ের রানির ঘরে তিরিশ নৌকার দরকার পড়লে, সেই রানির রাজ্য তার নিজের হাতে নেই।
লীলাবতী- তিনি আমাদের দান করছেন না। তিনি আমাদের কিনছেন।
নন্দিনী খাতাটা খুলল, আর তার কলম কাগজে ছোঁয়ার আগেই সে বলল।
নন্দিনী- সিপাহী চাই। কারণ মহারাজের অবর্তমানে এই রাজবাড়িতে এখন চারশো লোক আছে, আর সেই চারশো লোকের মধ্যে তিনশো জানে না কাল কে রাজা হবে।
নন্দিনী- দিলে খরচ আছে, না দিলে রক্ত আছে। আমি খরচ নেব।
রুদ্র তখন পর্যন্ত কিছু বলেননি। তিনি উঠে দাঁড়ালেন, সিপাহীর কাছে গেলেন, আর তারপর তার হাতটা তার কাঁধে রাখলেন।
রুদ্র- ভাত খেয়েছিস?
সিপাহী- না, যুবরাজ।
রুদ্র- ভজু, ওকে পিছনের রান্নাঘরে পাঠান। আর এই নলটা নৌকোয় যাকে দিয়েছিলি, তার নাম?
সিপাহী- মাঝি, যুবরাজ।
রুদ্র- সে কোথায়?
সিপাহী- ঘাটে অপেক্ষা করছে। আর একটা কথা বলেছেন আপনার জন্য, যুবরাজ। বলেছেন গলায় নয়, চোখে নয় — কাগজে।
ভজু সিপাহীকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন, আর ঘরে তিনজন নারী তিন দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ভজু ফিরে এলেন, হাতে একটা ছোট ভাঁজ করা কাগজ, যার ওপর কোনো সিল নেই।
যুবরাজ,
যে দিন আপনার নৌকো ভৈরবগড়ের ঘাটে লাগল, সেই দিন ভোরবেলা
আমার এক মাঝি ঘাট থেকে ছয় কোস দূরে জলের দিক দেখতে গিয়েছিল।
সে ফিরে আমাকে বলেছে, সেখানে একটা ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল,
আর গাড়ি থেকে একজন নারী নামছিলেন।
গাড়িতে চিহ্ন ছিল ছয় কোসের জমিদারবাড়ির।
আপনার দিদিমণি কবে ফিরেছেন, সেটা আপনি জানেন।
আমি শুধু জানি, যখন আপনি আমার ঘাটে নামলেন,
তখন তিনি ইতিমধ্যেই সুবর্ণগড়ের পথে ছিলেন।
আর সেই পথে শহরে ঢোকার একটা দরজা আছে,
যেটার হিসাব আপনার কাছের একজন রাখেন।
তিন মাস শেষ হলে ফিরে আসব।
ই.
রুদ্র কাগজটা তিনবার পড়লেন, তারপর ভাঁজ করে নিজের কোমরে গুঁজে নিলেন, আর তার মুখে কোনো ভাব এলো না। এই বাড়িতে এই মুখটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ কেউ একবার এই মুখ দেখলে কিছু বুঝতে পারে না।
ভজু বেরিয়ে গেলেন, আর তারপর ঘরে যা হলো, সেটা কেউ প্রত্যাশা করেনি। ভবানী উঠে দাঁড়ালেন, আর সোজা চন্দ্রলেখার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন — এত কাছে যে দুই নারীর কাচের চুড়ি প্রায় ঠেকে যায়।
ভবানী- রানি, আপনি আজ প্রস্তাবের পক্ষে কথা বললেন।
চন্দ্রলেখা- বললাম।
ভবানী- কেন?
চন্দ্রলেখা- কারণ এত বছরে এই দরবারে আমার নাম একবারও পড়া হয়নি, আর কাল করোনেশনে পড়া হবে। নতুন রানির পদটা তো কেউ ছাড়ে না।
ভবানী- আর আমার ছেলে?
চন্দ্রলেখা- আপনার ছেলে দুই মাস পরে রাজা, আর তিন মাস পরে স্বামী। এই ঘরে আমি সাত বছর ধরে স্বামীর পাশের চেয়ারটা আগলে বসে আছি, রানিমা।
চন্দ্রলেখা- আমার একটা চেয়ার দরকার।
ভবানী কিছু বললেন না। তিনি ফিরে এসে নিজের আসনে বসলেন, আর দুই হাত নিজের কোলের ওপর রাখলেন, একেবারে স্থির।
ভবানী- তাহলে আজ থেকে আমার চুড়ি আর রাখব না।
ভবানী- ওটা কেউ খেয়াল করবে না, রানি। কিন্তু এই বাড়ির যারা প্রতিদিন রান্নাঘরে দাঁড়ায়, তারা খেয়াল করবে। আর ওরা ঠিক করে নেবে, কাল থেকে কার কথা শুনবে।
চন্দ্রলেখা- ধমক?
ভবানী- না। হিসাব।
চন্দ্রলেখা কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন, চুপিচুপি বললেন, যেন ঘরের কেউ শুনবে না।
চন্দ্রলেখা- যুবরাজ, আমাকে একটা কথা দিতে বললাম না, শুধু বলি — যার চিঠি এসেছে, তাকে ফেরত দেবেন না। ইনি একবার এই দরবারে ঢুকলে, ভিতরের সব হিসাব একবার নতুন করে লেখা হবে।
চন্দ্রলেখা- আর নতুন হিসাবে আমার নামটা কোথায় থাকবে, সেটা তিনি ঠিক করবেন।
রুদ্র কিছু বললেন না। তিনি দরবার ছেড়ে উঠোনে গেলেন, আর সেখান থেকে সিঁড়ি ধরে উপরে, তার বাবার ঘরের দিকে।
উঠোনে তখন সন্ধ্যা নামছিল, আর রান্নাঘরের ধোঁয়ার সঙ্গে একটা গন্ধ মিশে আসছিল — লবঙ্গ, আর পোড়া ঘিয়ের। আর ঠিক তখনই, বাড়ির গেটের বাইরে থেকে একটা শব্দ এলো, যেটা এই বাড়ির কেউ সাত বছর ধরে শোনেনি।
গাড়ির চাকার শব্দ। ছোট, সরু, একটা মাত্র গাড়ির।
রুদ্র দরজা ঠেলে ঢুকলেন, আর ঘরটা আগের মতোই ছিল — ওষুধের বাটি, রুপোর গেলাস, আর কাঠের মেজের ওপর সাজানো কাগজ।
কিন্তু একটা জিনিস বদলে গেছে। মহারাজ খড়ের গদিতে হেলান দিয়ে বসে আছেন, আর তার গায়ে উত্তরীয়, হাতে আংটি, আর চুল আঁচড়ানো। মৃত্যু-আসন্ন রাজার প্রথম কাজ — নিজেকে দরবারের মতো সাজানো।
বিক্রম- বোস।
রুদ্র- আপনি উঠেছেন।
বিক্রম- দু'বার উঠেছিলাম, তোর জন্য। তুই আসিস নি।
রুদ্র- আমি ভৈরবগড়ে ছিলাম।
বিক্রম- জানি। জিজ্ঞেস করছিলাম, তুই কী নিয়ে আসলি।
রুদ্র পাশে বসলেন, আর তার বাবার শুকনো হাতটা নিজের হাতে নিলেন। হাতটা ঠান্ডা ছিল না, কিন্তু হালকা — যেন হাড়ের ওপর চামড়া আর কিছু নেই।
ঘরে একটা দীর্ঘ নীরবতা নামল, আর তারপর মহারাজ হাসলেন — একটা শুকনো, হারানো হাসি, যা এতদিন কেউ দেখেনি।
বিক্রম- দ্বিতীয় বছর থেকে।
রুদ্র- কেন আপনি থামান নি?
বিক্রম- কারণ আমি থামালে তোর মা জিজ্ঞেস করতেন, আর আমি সত্যি বললে তোর মা ভাঙতেন।
বিক্রম- আর আমি চাইনি আমার রানি ভাঙুক, কারণ যে রানি ভাঙে, সেই রানি তার সন্তানদের জন্য নখ বাড়ায়।
বিক্রম- মৃণালিনীকে আমি বিয়ে দিয়েছিলাম একটা জমিদারবাড়িতে। বাবা হিসাবে আমার হাতে তখন যা ছিল, সেটা ছিল একটা শাড়ির দাম আর একটা প্রতিশ্রুতি।
বিক্রম- আমি সেই প্রতিশ্রুতিটা রক্ষা করতে পারিনি। তাই তোর মা চুরি করেছেন, আর আমি চুরিটা দেখে চোখ বন্ধ করেছি, আর ওটাই আমার রাজত্বের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
রুদ্র কিছু বললেন না। তার গলা শুকিয়ে এসেছিল, আর তিনি সেটা আলোচনা করার মতো জায়গায় ছিলেন না।
বিক্রম- হাতটা ছাড়িস না। আজ রাতে বাড়া নয়।
বিক্রম- এখন শোন, আর একটা কথাও বলব না পরে। তোকে আমি অন্তঃপুরে পাঠিয়েছিলাম, আর তুই ভাবিস সেটা ছিল শাস্তি।
রুদ্র- না।
বিক্রম- ছিল, আর ছিল আমার শেষ পরীক্ষা।
বিক্রম- রাজা যে মরে, তার সিংহাসন নেয় কেউ; কিন্তু রাজা যে মরে, তার অন্তঃপুর নেয় বেশি লোক। এই বাড়ির দরজাগুলো আমার হাতে ছিল, আর আমি জানতাম আমার পরের রাজা যদি এই দরজাগুলো না চেনে, তাহলে সে দুই মাসে শেষ হবে।
বিক্রম- তাই আমি তোকে পাঠালাম ওই নারীদের ভিতরে, কিছু না দিয়ে, কিছু বলে না দিয়ে। যে ছেলে নিজের বাড়ির নারীদের চিনতে পারে না, সে সিংহাসনে বসে না, সিংহাসনে বসে অন্য কেউ।
তিনি কাশলেন, আর রুদ্র এগিয়ে জল এগিয়ে দিলেন, কিন্তু তিনি গেলাসটা নিলেন না।
বিক্রম- একটা কাজ বাকি।
রুদ্র- বলুন।
বিক্রম- চিঠি এসেছে, তাই না? লাল সিল।
রুদ্র- এসেছে।
বিক্রম- ইলা ভালো মেয়ে।
রুদ্র- আপনি চেনেন?
বিক্রম- বাবার বয়সে এই কাজ হয় না। আমি ওকে দুইবার দেখেছি — একবার বিয়েতে, একবার ভাইয়ের মরণে। ও সেদিন কাঁদেনি, আর ওই না কাঁদাটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগা জিনিস ছিল।
বিক্রম- ওকে ফিরিয়ে দিস না। ও আসতে চাইছে কারণ ওর রাজ্যে ওর হাত নেই। তুই ওকে দরবার দিলে, ও তোকে একটা রাজ্য দেবে — সেটা দান নয়, সেটা ব্যবসা। আর ব্যবসা আমার বংশে চলে।
তারপর তিনি হাতটা সরিয়ে নিলেন, আর সোজা হয়ে বসলেন, আর তার গলাটা এমন হলো যেন কোথা থেকে ভাড়া এনে বসানো হয়েছে — রাজার গলা।
বিক্রম- ভজু।
ভজু বাইরে দরজার পাশে ছিল, সে ভিতরে এলো।
বিক্রম- কাল সকালে করোনেশন হবে।
ভজু- মহারাজ, উৎসব-আয়োজন…
বিক্রম- উৎসব লাগবে না। তিন প্রজন্মের সেনাপতি, দুই রানির সাক্ষী, আর একটা সিল। যতটুকু কাগজ লাগে, ততটুকু লেখ।
বিক্রম- আর একটা কথা — আমার ঘরে কাল সকালে কেউ ঢুকবে না। সিংহাসনে বসার আগে ছেলের বাবার ঘরে ঢোকা উচিত নয়। কারণ তখন ছেলে ভাবে সে বাবাকে দেখতে এসেছে, কিন্তু বাবা সেটা দেখে ভাবে ছেলে বিদায় নিতে এসেছে।
বিক্রম- আমি ওই মুখটা দেখতে চাই না।
রুদ্র তারপরও উঠে দাঁড়ালেন, আর তার বাবার কপালে হাত রাখতে গেলেন, কিন্তু মহারাজ তার হাতটা ধরে ফেললেন, আর নিজের বুকের ওপর রাখলেন।
বিক্রম- তুই এখন যাবি।
রুদ্র- কোথায়?
বিক্রম- তোর মায়ের ঘরে।
রুদ্র- বাবা।
বিক্রম- যা। আজ রাতে তোর মা একা, আর আমি জানি ও একা কেন।
বিক্রম- আর একটা কথা, শেষ। তোর দিদিমণি আজ রাতে কারও ঘরে থাকবে না। ওর নিজের ঘরে থাকবে, আর সেই ঘরে তুই কাল যাবি, সিংহাসনে বসে সবার সামনে ওর পাশে হাত রেখে।
বিক্রম- তুই এমন করিস না। আমি জানি তুই করিস না। কিন্তু আমার নামে বলবি — বলবি, এটা মহারাজের শেষ হুকুম।
রুদ্র দরজার কাছে গেলেন, তারপর পিছনে ফিরে তাকালেন। মহারাজ তখন আবার হেলান দিয়ে বসে আছেন, আর ঘরের প্রদীপটা তার শুকনো মুখে আলো ফেলছে।
বিক্রম- রুদ্র।
রুদ্র- বলুন।
বিক্রম- আমার ঘরে কাল সকালে কেউ ঢুকবে না।
বিক্রম- কিন্তু যদি তুই সিংহাসনে বসতে বসতে ভুলে যাস আমি কে, তাহলে তুই আমার বাড়ির লোক না।
দরজা বন্ধ হলো। আর কোথা থেকে, বাড়ির বাইরের উঠোন থেকে একটা ঘোড়ার ঘণ্টা বাজল।
রানিমার দরজা খোলা ছিল, আর ভিতরে একটা প্রদীপ জ্বলছিল — কম, লুকিয়ে।
রুদ্র ভিতরে ঢুকলেন, আর দেখলেন — ভবানী বিছানার কিনারায় বসে আছেন, চুল খোলা, হাতে কাচের চুড়ি আর একটা কাঁচের ছোট বোতল — নারকেল তেল। তিনি আজ রাতে কাউকে ডাকেননি, কিন্তু সাজেনও নি; যেটা তার সবচেয়ে বড় সাজ।
ভবানী- দরজা লাগাবি না।
রুদ্র- লাগাইনি।
ভবানী- আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবি না। বস।
রুদ্র বিছানার ওপর বসলেন, আর ভবানী তার চুলটা আঁচড়াতে শুরু করলেন — নিজের নয়, প্রথমে, তারপর হাতটা স্থির হয়ে গেল।
ভবানী- তুই জানিস, আমি কেন চল্লিশ দিন তোকে ডাকি নি?
রুদ্র- জানি না।
ভবানী- কারণ আমি জানতাম তুই ফিরবি। আর ফিরলে প্রথমে আমার ঘরে আসবি, আর সেটা হিসাব নিয়ে আসবে।
ভবানী- আমি চাইনি আমার ছেলে আমার ঘরে ঢুকে আমাকে জেরা করুক। তাই আমি ভেবেছিলাম, সময়টা যেতে দিই।
ভবানী- সময় যায় না, রুদ্র। সময় শুধু শুকিয়ে যায়।
তিনি বোতলটা খুললেন, আর নিজের হাতের তালুতে তেল ঢেলে নিয়ে সেটা তার নিজের বাহুতে ঘষতে লাগলেন, আস্তে। তার শুকনো হাত, তার পোড়া আঙুল, তার কাচের চুড়ি — সব একসঙ্গে একটা শব্দ করছিল।
ভবানী- আজ রাতে তোর বাবা তোকে এখানে পাঠিয়েছেন।
রুদ্র- হ্যাঁ।
ভবানী- উনি জানেন?
রুদ্র- উনি জানেন।
ভবানী- তা হলে উনি আমার চেয়ে বড়।
ভবানী হাতের তেলটা টেবিলে রাখলেন, তারপর তার দুই হাত নিজের গলায় রাখলেন, এমনভাবে যেন অনেকদিন ধরে কেউ একটা দাম জিজ্ঞেস করে না।
ভবানী- এই নিয়মগুলো আমি বানিয়েছি, রুদ্র। রাতে দরজা লাগাবে না, সকালে হিসাব চাইব।
ভবানী- আমি সেটা বানাই নি তোর জন্য, বা এই বাড়ির মেয়েদের জন্য। আমি বানাইছি একজনের জন্য, যে সাত বছর ধরে একটা বাড়িতে ছিল, যেখানে সে কারও ছিল না।
ভবানী- তুই ফিরে এলি, আর আমার হাত আর ফাঁকা রইল না।
ভবানী- আজ রাতে তুই এখানে আছিস, তাই তেলটা বাক্সে থাকবে না।
রুদ্র তার হাত বাড়ালেন, আর ভবানী নিজের কাপড়টা বুকের ওপর থেকে নামিয়ে ফেললেন, একবারে, কোনো ধাপ না রেখে — যেন এটা ব্যবসার নয়, যেন এটা হিসাব।
তার শরীর চল্লিশের বেশি, আর এই বাড়িতে সবাই জানে — ভারী, নিচু, প্রাকৃতিক বুক, যেটা তিন সন্তান পরেও তার মালিকানা ছাড়েনি। পেটের নিচে সরু একটা ভাঁজ, আর ডান দিকে পাঁজরের নিচে একটা পুরনো ফ্যাকাশে দাগ, যেটা রুদ্র জন্মের আগে থেকে আছে। তার নাভির নিচে চুলের একটা সরু রেখা, আর সেই রেখার নিচে সারা শরীরের সবচেয়ে গোপন একটা তিল, যেটা তার আঁচল কখনো ঢাকে না আর কখনো দেখায় না।
ভবানী- তাকাস না।
রুদ্র- কেন?
ভবানী- কারণ তোর চোখ আমার শরীরে লাগলে, আমি হিসাব ভুলে যাই।
রুদ্র তার ঘাড়ে ঠোঁট রাখলেন, আর ভবানীর দুই হাত তার মাথার পিছনে গিয়ে পড়ল, শক্ত করে। তার নিঃশ্বাসের শব্দটা উঠোনের ঝিঁঝির শব্দের সাথে মিশে গেল।
প্রথম ঢোকার সময় তিনি একটা দীর্ঘ, কেটে যাওয়া শব্দ করলেন — অর্ধেক গলায়, অর্ধেক বুকের মধ্যে — আর তার হাতের কাচের চুড়িটা বিছানার কাঠে ঠেকে একবার বেজে উঠল।
ভবানী- আস্তে না। দ্রুত।
রুদ্র- ব্যথা?
ভবানী- না। আজ রাতে ব্যথা চাই।
রুদ্র গতি বাড়ালেন, আর ভবানী তার পিঠে দুই হাতের দশ আঙুল ছড়িয়ে দিলেন, নখ নামিয়ে, ঠিক ততটুকু যতটুকু রক্ত না আনে। তার পেটের কাঁপুনি নিয়মিত ছিল, গভীর ছিল, আর প্রতিবার ঠাপের শেষে একটা ছোট চাপা শব্দ — যেটা তিনি নিজেই জানেন, সেটা এই বাড়ির দরজায় পৌঁছে যায়, আর আজ রাতে সেটা যাওয়াটাই দরকার।
ভবানী- ইসসস। থামিস না।
ভবানী- তোর বাবা আজ রাতে ঘরের দরজা লাগিয়ে ঘুমোবেন।
তিনি দুইবার এলেন, দ্বিতীয়বার ছোট নয় — দ্বিতীয়বার তার পুরো শরীর ধনুকের মতো বেঁকে গেল, আর তার পরে অনেকক্ষণ তিনি কিছু বললেন না, শুধু রুদ্রের বুকের ওপর মাথা রেখে শ্বাস নিলেন।
তারপর ভবানী উঠে বসলেন, চুলটা আঁচড়ে বেঁধে ফেললেন, আর কাপড়টা আবার গলায় তুললেন। তিনি এখন আর নরম ছিলেন না।
ভবানী- কাল সকালে তুই সিংহাসনে বসবি।
রুদ্র- বসব।
ভবানী- আর তোর দিদিমণিকে পাশে বসাবি?
রুদ্র- বাবার হুকুম।
ভবানী- হুকুম না। তুই আসলে বসাবি। আমি জানি তোকে কেউ বাধ্য না করতে পারে, কেবল একটা জিনিস পারে — সেটা হলো টাকা।
ভবানী- আর আমি জানি তুই আমাকে ক্ষমা করবি, কারণ তুই আমার ছেলে, আর একটা বাড়তি কথা — কারণ আমি সাত বছর চুরি করেছি আর কেউ ধরে নি, শুধু ওই একজন ছাড়া।
ভবানী- শিবানন্দ। যুবরাজ, তুই ওই লোকটাকে ছাড়িস না।
ভোরের আলো দরজার ফাঁক দিয়ে ঘরে পড়ল, আর ঠিক সেই সময়ে বাড়ির বাইরের উঠোনে একটা ঘোড়ার ঘণ্টা বাজল — একবার, তারপর আবার, তারপর অনেকগুলো একসঙ্গে। এক নয়, একটা কাফেলা।
রুদ্র জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন, আর দেখলেন — বাইরের গেটের সামনে ছয়টা ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে, প্রত্যেকটায় রাজকীয় পতাকা, আর সবচেয়ে সামনের গাড়ি থেকে একজন নারী নামছেন। কালো শাড়ি, হাতে কোনো চুড়ি নেই, আর কপালে সিঁদুরের বদলে একটা লাল টিপ — যেটা কেবল মহারাজ না থাকলে পরা হয়।
ভবানী পিছনে এসে দাঁড়ালেন, আর তার গলাটা একটা মাত্র স্তরে নামল।
ভবানী- এ কে?
রুদ্র- ভৈরবগড়ের রানি।
ভবানী- চিঠিতে তিন মাস লেখা ছিল।
রুদ্র- লেখা ছিল।
ভবানী একবার উঠোনের দিকে তাকালেন, তারপর নিজের আঁচলটা টেনে ছেলের কাঁধ থেকে একটু ধুলো ঝেড়ে দিলেন।
ভবানী- যা। সোজা হয়ে যা।
ভবানী- আজ সকাল থেকে তুই আমার ছেলে নোস, তুই সুবর্ণগড়।