দরবারে আজ কেউ খাতা নিয়ে আসেনি, কারণ খাতা এখন তিনজন মিলে রাখে — রানিমা, খালা, আর যুবরাজ নিজে। খাতা নেই, কিন্তু হিসাবটা আছে, আর সেটা নিয়ে এলেন ভৈরবগড়ের দূত।
দূত- যুবরাজ, আমার রাজা প্রতিশ্রুতি বদলে ফেলেছেন।
রুদ্র- কে মারা গেছেন?
দূত- আমার রাজার বোন। তাই বিয়ের প্রশ্ন নেই।
রুদ্র- তাহলে এখন কী?
দূত- এখন তিনি আপনাকে চান। তিন মাসের অতিথি হিসাবে, ভৈরবগড়ে।
সভা-ঘরে চুপ। ভজু নতুন মন্ত্রীর পদে বসেছে আজ সকালেই, কিন্তু তার হাতে এখনো খাতা নেই — শুধু একটা ভাঁজ করা কাগজ, যেটা সে মুঠোয় ধরে আছে।
ভজু- যুবরাজ।
রুদ্র- বল।
ভজু- সন্ধি যদি না হয়, তাহলে এই তিন মাস কোন দিকে?
দূত- আমার রাজা আপনার রাজাকে দেখতে চান না, যুবরাজ। তিনি আপনাকে ধরে রাখতে চান।
রুদ্র- কেন?
দূত- কারণ আপনার বাবার দুই মাস আছে। আর সিলটা আজ তরুণ একটা হাতে।
দূত- এই অবস্থায় কারও রাজ্যে সিল তরুণ হাতে থাকলে, প্রতিবেশী অপেক্ষা করে। আর আপনার প্রতিবেশী অপেক্ষা করছে না।
একজন সভাসদ উঠে দাঁড়ালেন, মোটা, বয়স্ক, যার হাত কাঁপে — তিনি আজকাল দরবারে কিছু বলেন না, শুধু সই করেন।
সভাসদ- যুবরাজ, সন্ধি রাখা দরকার।
রুদ্র- সন্ধি রাখতে গিয়ে যদি রাজ্যটাই চলে যায়?
সভাসদ- তাহলে সন্ধি রাখলে অন্তত একটা বছর পাওয়া যায়।
রুদ্র- আর সেই এক বছরে যদি আমার বাবা মরে যান?
সভাসদ- সেটা ঈশ্বরের হাতে, যুবরাজ।
রুদ্র- না। ওটা আমার হাতে। আর হাতে থাকলে ঈশ্বরের উপর ছাড়া যায় না।
দূত চলে গেলে রুদ্রসেন চৌকিতে বসে রইল, আর পর্দার ওপাশ থেকে লীলাবতী পিসিমা বেরিয়ে এলেন, হাতে ওষুধের শিশি।
লীলাবতী- হিসাবটা সোজা। তুই গেলি, আর তোর বাবা মরে গেল, তাহলে এই সিলটা কার, সেটা ভৈরবগড় ঠিক করে দেবে।
রুদ্র- তাহলে যাব না।
লীলাবতী- না গেলে তারা বলবে তুই ভয় পেয়েছিস, আর সন্ধি ভাঙবে।
রুদ্র- তাহলে?
লীলাবতী- তাহলে একটা কাজ করতে হবে, যেটা তোর বাবা আর করতে পারেন না।
লীলাবতী- রাজাকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। কিন্তু রাজার ঘোষণা বাঁচিয়ে রাখা যায়।
লীলাবতী ওষুধের শিশিটা টেবিলে রাখলেন, তারপর ভজুকে ডাকলেন।
লীলাবতী- ভজু, আজ মন্ত্রীর পদে তোকে বসাতে হবে।
ভজু- আমি রান্না জানি না।
লীলাবতী- তুই যা জানিস, সেটাই দরকার।
লীলাবতী- কারণ তুই একমাত্র লোক যে মহারাজের ঘরের পাশে সাত বছর দাঁড়িয়ে থেকেছ, আর একটা কথা কখনো কারও কাছে বেচিস নি।
পর্দার পিছনে শর্মিষ্ঠা খাতাটা খুলেই ফেলেছিলেন, আর তার কলম চলছিল। তিনি মুখ তুলে বললেন।
শর্মিষ্ঠা- আজ থেকে এই বাড়ির হিসাব দুই ভাগে লেখা হবে। বাইরের হিসাব ভজুর হাতে, আর ভিতরের হিসাব আমার হাতে।
লীলাবতী- তোর বোন রাজি?
শর্মিষ্ঠা- দিদি রাজি হবে। কারণ দিদি জানে, হিসাব যদি একজনের হাতে থাকে, তবে সে একদিন মন্ত্রী হয়ে যায়।
ভজু ঠিক সেই সময়ে পর্দার ওপাশে একটা সরু ছায়া দেখল, আর সেটা সরেও না, টলে না। সে তপতী — শর্মিষ্ঠার মেয়ে, যার হাতে আজ কোনো খাতা নেই, কিন্তু যার চোখ দুটো আজকের এই তিনটে লাইনের চেয়ে বেশি দেখছে।
রুদ্র- ভজু।
ভজু- যুবরাজ।
রুদ্র- তিন মাসের দিন গুনে রাখ।
ভজু- শুরু কবে থেকে?
রুদ্র- আজ থেকে।
ভজু বেরিয়ে গেলে শর্মিষ্ঠা খাতাটা বন্ধ করলেন, আর লীলাবতী পিসিমা চলে গেলেন মহারাজের ঘরে।
রুদ্র- খালা।
শর্মিষ্ঠা- বল।
রুদ্র- কতদিন তুই এই খাতা রাখবি?
শর্মিষ্ঠা- যতদিন তুই এই ঘরে থাকিস।
রুদ্র- আর না থাকলে?
শর্মিষ্ঠা- না থাকলে খাতাটা তোর মায়ের হাতে ফিরে যাবে, আমার কাছে থাকবে না।
রুদ্র- কেন?
শর্মিষ্ঠা- কারণ আমি এই বাড়িতে অতিথি। অতিথি এই বাড়িতে খাতা চালায়, খাতা রাখে না।
শর্মিষ্ঠা- আর এই শিক্ষাটা আমার মেয়েটা না শিখে ফেলেছে — সেটাই আজকের সবচেয়ে খারাপ খবর।
তপতী পর্দার পাশ থেকে সরে গেল, আর তার পায়ের শব্দ হলো না। এই বাড়িতে কেউ তাকে হাঁটতে শেখায়নি, শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে শিখিয়েছে।
আর সেই সন্ধ্যায় উপরে মহারাজের ঘরে একটা কাগজ লেখা হলো। তিনজন সাক্ষী, একটা সিল, আর একটা শুকনো হাত।
ভজু খাতা হাতে দাঁড়াল, লীলাবতী পিসিমা ওষুধের বাটি হাতে, আর দুজন দাসী সাক্ষী হিসাবে দরজার পাশে। মহারাজ খড়ের গদিতে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন, আর আজ সন্ধ্যায় তার গলায় কাশি ছিল না — শুধু একটা শুকনো শ্বাস।
বিক্রম- লিখ।
ভজু- কী লিখব, মহারাজ?
বিক্রম- লিখ, সুবর্ণগড়ের যুবরাজ রুদ্রসেন আজ থেকে খাজনার সিলের অধিকারী। আর সে বাইরে থাকলেও সেই সিল কারও হাতে যাবে না।
ভজু- আর যদি আপনি…
বিক্রম- যদি মরে যাই, সেটাও লিখ। মরে গেলে সিংহাসন ওর, আর সেখানে কারও সই লাগবে না।
লীলাবতী পিসিমা ওষুধের বাটিটা এগিয়ে দিলেন, কিন্তু মহারাজ হাত দিয়ে সরিয়ে দিলেন।
বিক্রম- না। আজ রাতে আমি ঘুমোব না। আজ রাতে আমার ছেলের নাম একটা কাগজে উঠছে, আর আমি সেটা চোখ খুলে দেখব।
তারপর তিনি রুদ্রকে কাছে ডাকলেন, আর তাঁর শুকনো হাতটা ছেলের হাতের ওপর গিয়ে পড়ল।
বিক্রম- তোর মায়ের ঘরে তালা লাগাবি না। কিন্তু একটা কথা — এই কাগজের নিচে আমার সই তুই নিস না। ভজু নেবে।
রুদ্র- কেন?
বিক্রম- কারণ আমি রাজা ছিলাম। রাজার হাত কাঁপে না, রাজার হাত ধরে দেওয়া হয়।
সিলটা কাপড় থেকে খুলে টেবিলে রাখা হলো, আর তারপর মহারাজ চোখ খুলে রইলেন — অনেকক্ষণ, একটা শুকনো হাত ছেলের হাতের ওপর রেখেই।
রাত এগারোটার দিকে দরজায় টোকা পড়ল, আর রুদ্রসেন নিজেই উঠে দরজা খুলল — কারণ এই বাড়িতে এখন দরজা লাগানোর নিয়ম নেই, আর টোকা দেবে সে-ই, যে ভিতরে আসতে চায়।
দরজার ওপাশে তপতী দাঁড়িয়ে ছিল, আর তার হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ। গায়ে সাদা কাপড়, চুল ভেজা — গোসল সেরে এসেছে, এই বাড়ির জলে।
রুদ্র- এত রাতে?
তপতী- দিনের বেলা আপনাকে কেউ একা ছাড়ে না।
রুদ্র- তুই কে?
তপতী- খালাতো বোন। আপনার ডাইনে তাকালে হিসাব হয় না, তাতে পায়ে লাগে।
রুদ্র- ভিতরে আয়।
সে ভিতরে এল, দরজার কাছে দাঁড়াল, তারপর ঘরটা একবার দেখে নিল — খাট, প্রদীপ, জানালা, আর দেওয়ালে ঝোলানো তলোয়ার। তারপর সে বসল, কিন্তু খাটে নয়; মেঝের ঠিক মাঝখানে, পা গুটিয়ে।
তপতী- একটা কথা বলব।
রুদ্র- বল।
তপতী- ভৈরবগড়ের প্রস্তাবটা আপনি নেবেন না।
রুদ্র- তুই কোথা থেকে জানলি?
তপতী- মায়ের খাতায় আজ সকালে লেখা হয়েছে।
তপতী- মা দরবারে ছিলেন না, কিন্তু পর্দার পিছনে ছিলেন। আর মা যা শোনেন, সব খাতায় ওঠে।
রুদ্র- তুই মায়ের খাতা পড়িস?
তপতী- পড়ি। মা জানেন না।
রুদ্র তার দিকে তাকিয়ে রইল। উনিশের একটা মেয়ে, যার কপালে একটা কাটা দাগ, আর হাতের তালুতে রান্নার পুরনো পোড়া। সে তার দিকে তাকাল না, শুধু নিজের আঙুলে কাগজটা ভাঁজ করতে লাগল, আর সেটাই তার একমাত্র অস্বস্তি।
রুদ্র- তুই কী চাস?
তপতী- আমি চাই ভৈরবগড়ে যেতে।
তারপর সে কাগজটা নামিয়ে রাখল, আর তার কথা শেষ হলো — কিন্তু তার হাত থামল না। সে উঠে দাঁড়াল, আর নিজের কাপড়টা গলার ওপর দিয়ে খুলে ফেলল, তারপর আবার বসল, খাটের কিনারায়।
রুদ্র- এটা কী করলি?
তপতী- কারণ আমি যেতে চাই, আর আমি জানি এই বাড়িতে একটা দাম কত।
তপতী- মাটিতে হবে না। খাটে।
রুদ্র তার পাশে বসলেন, তারপর তার কাঁধে হাত রাখলেন। তপতী চোখ বন্ধ করল, আর তার শরীর প্রথমবার একটু কেঁপে গেল, তারপর স্থির হয়ে গেল, ঠিক যেন কোনো খাতার পাতা পড়ছে।
রুদ্র- ব্যথা করলে বলবি।
তপতী- বলব।
তিনি তার বুকের ওপর হাত রাখলেন — উনিশের শক্ত ভারী বুক, বুকের নিচে একটা ছোট দাগ, ঠিক পাঁজরের কোণায়। তারপর নিচে, পেটের ওপর, তারপর সোজা দুই পায়ের মাঝখানে। তপতী একটা ছোট শব্দ করল, আর সেটা ছিল প্রথম সত্যি শব্দ যা সে আজ রাতে করল।
রুদ্র- তোর শরীর ভেজা।
তপতী- গোসল করেছি।
রুদ্র- না। আমি অন্য জায়গার কথা বলছি।
তপতী চোখ খুলল, আর তার মুখটা প্রথমবার লাল হলো।
তপতী- তাও তো… ভালো।
তপতী- ইসসস।
সে তাকে খাটে শুইয়ে দিল, তারপর নিজে তার ওপর এলেন। ঢোকার আগে একবার থামলেন।
রুদ্র- বল।
তপতী- ঢোকা।
প্রথম ঢোকার পরেই তার দুই হাত খাটের চাদর খামচে ধরল, আর তার গলার শব্দটা সে নিজের কাঁধের ভিতরে চেপে ফেলল। রুদ্র ঠাপ দিতে লাগল আস্তে, কারণ তার শরীর বলছে না, তার চোখ বলছে — চোখটা পুরো খোলা, আর সেটা ছাদের দিকে।
তপতী- আরও।
রুদ্র- ব্যথা?
তপতী- আরও।
কুড়ি ঠাপের মাথায় সে একবার এল, ছোট একটা কাঁপুনি দিয়ে, আর তার পেটের নিচে জল খসে গেল চাদরে। রুদ্র থামল না।
তিনি তাকে পাশ ফিরিয়ে দিলেন, একটা পা নিজের কোমরে তুলে নিলেন, তারপর পিছন থেকে ঢুকলেন আবার। তপতী এবার কোনও শব্দ করল না, শুধু একটা নিচু ঘষা শব্দ বেরোচ্ছিল তার গলার ভিতর দিয়ে, যেটা অনেকক্ষণ ধরে চলছিল।
রুদ্র- তুই ভয় পাচ্ছিস না?
তপতী- ভয় পাচ্ছি।
রুদ্র- তাহলে?
তপতী- তখনই তো কাজ করা ভালো।
দ্বিতীয়বারে সে বুকে-পিঠে দুই হাত ছড়িয়ে ধসে পড়ল, আর তার দুই পা একসঙ্গে কেঁপে গেল।
কিছুক্ষণ পরে সে উঠে বসল, আর নিজের কাপড়টা আবার গলায় তুলে নিল, যেন কিছু হয়নি।
রুদ্র- তুই যেতে পারবি না।
তপতী- পারব।
রুদ্র- কারণ?
তপতী- কারণ নামটা আমার খাতায় আছে, আর মা তা মুছতে পারবেন না, কারণ মায়ের খাতায় নিজের মেয়ে লেখা থাকে না।
তপতী- আর একটা কথা, যুবরাজ। আপনি ভৈরবগড়ে গেলে ফিরবেন না। আর আপনি না ফিরলে, এই বাড়িতে বসবে মা, দিদিমণি, আর চন্দ্রলেখা রানি।
তপতী- কেউই আপনি নন।
সে দরজায় গিয়ে দাঁড়াল, তারপর পিছনে তাকাল না, শুধু একটা হাত দরজার চৌকাঠে রাখল।
তপতী- কাল সকালে ভজু দাদার কাছে একটা নাম দিয়ে যাব।
রুদ্র- কোন নাম?
তপতী- আমার।
দরজা খোলা রইল, আর বাইরে করিডোরে প্রদীপের আলো একবার কেঁপে গেল — কেউ সরে দাঁড়াল, তারপর শব্দহীন হয়ে গেল।
সকালবেলা রানিমার ঘরে সভা বসল, আর এসেই দেখা গেল দুটো জিনিস বদলে গেছে। এক, খালা শর্মিষ্ঠার হাতে আজ খাতাটা নেই; সেটা রাখা আছে দরজার পাশে, যেখানে কেউ সহজে পড়তে না পারে। আর দুই, চন্দ্রলেখা রানি আজ সাজেননি — চুলে তেল নেই, কপালে তিলক নেই।
তারা সাজ না করলে এই বাড়ির সবাই জানে, আজ তিনি কিছু চাইতে এসেছেন।
চন্দ্রলেখা- রানিমা, একটা কাজ আমি করে রেখেছি, না জিজ্ঞেস করে।
ভবানী- কী কাজ?
চন্দ্রলেখা- নন্দিনীর জন্য একটা ঠিকানা। ছয় কোস দূরে, একটা জমিদার বাড়ি।
ভবানী- কোন ঠিকানা?
চন্দ্রলেখা- ছয় কোস দূরে। একটা জমিদার বাড়ি, বয়স কম, আর লোক ভালো।
চন্দ্রলেখা- আমি ভেবেছিলাম, যার নাম এই বাড়ির খাতা থেকে কাটা হয়ে গেছে, তার একটা জায়গা দরকার।
শর্মিষ্ঠা- আর সেই জায়গাটা যদি আমার খাতায় লেখা না থাকে, তাহলে সেটা কাজের নয়।
চন্দ্রলেখা- তোমার খাতা আজ দরজার পাশে রাখা, রানি। আমি দেখেছি।
শর্মিষ্ঠা- দেখার জন্য রাখাইনি।
ঘর চুপ। নন্দিনী সভার এক কোণে বসা ছিলেন, আর তার হাতে সেই ছোট পিতলের বালাটা। তিনি উঠে দাঁড়ালেন না, শুধু বললেন, খুব ধীরে।
নন্দিনী- কে ঠিক করল?
চন্দ্রলেখা- আমি।
নন্দিনী- আমি তোকে জিজ্ঞেস করিনি।
চন্দ্রলেখা- জিজ্ঞেস করা হয় না ওই কাজে, যেটা ভিতরে দরকার।
নন্দিনী তার বালাটা আঙুলে চাপ দিয়ে ধরলেন, আর প্রথমবার তার গলায় রাগ এল — ছোট, ঠান্ডা।
নন্দিনী- আমি এই বাড়িতে এসেছি ছয় বছর পরে, আর আমার নিজের হাতে সিন্দুকটা নামিয়ে এনেছি। কেউ আমাকে পাঠায়নি, আমি নিজেই এসেছি।
নন্দিনী- আমাকে কেউ ঠিকানা দেবে না। আমি আমার ঠিকানা নিজে লিখব।
ভবানী- নন্দিনী।
নন্দিনী- রানিমা, আমি যে জায়গাটা বেছে নেব, সেটা আপনার পছন্দ না-ও হতে পারে।
তারপর তিনি ঘরের সবাইকে একবার দেখে নিলেন, আর তারপর যেটা বললেন, সেটা কারও প্রত্যাশিত ছিল না।
নন্দিনী- আমি যাব না।
ভবানী- কোথাও যাবি না?
নন্দিনী- না। এই বাড়িতেই থাকব।
চন্দ্রলেখা- সিঁড়ির মাথায় পড়ে থাকবি?
নন্দিনী- না। এই বাড়িতে এখন একজন মানুষ দুই মাস পরে রাজা হবেন, আর তিনি বাইরে থাকবেন। তাই এই বাড়িতে একজন থাকা দরকার, যে খাতায় নাম ছাড়াও দাঁড়াতে পারে।
নন্দিনী- সেই একজন আমি।
শর্মিষ্ঠা- তোকে কে সেই অধিকার দিল?
নন্দিনী- কেউ দেয়নি। আমি নিয়ে নিলাম।
লীলাবতী পিসিমা তখন হাতের আংটিটা ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, ঠান্ডা গলায়।
লীলাবতী- দরকার হলে ও নিজেই বেছে নিক। কিন্তু আজকের সভার আসল কথা অন্য।
লীলাবতী- তিন মাসের হিসাব আজ থেকে শুরু। আর এই রাষ্ট্রে সিল তরুণ হাতে। তাই মহারাজের ঘরে যেতে হবে, আর একটা ঘোষণা লিখিয়ে নিতে হবে — যাতে যুবরাজ বাইরে থাকলেও এই রাজ্যের কেউ সিল নিয়ে হাত বদল করতে না পারে।
শর্মিষ্ঠা- ঘোষণা যে লিখবে, সে কে?
লীলাবতী- ভজু। আর সাক্ষী থাকবে দুই বোন, আর মহারাজের তিন বছরের সেবক — আমি।
তখনই দরজায় ভজু এল, আর তার হাতে একটা কাগজ — যেটা সভার কাগজ নয়, ঘাটের খবরের কাগজ।
ভজু- যুবরাজ, দুটো খবর।
রুদ্র- বল।
ভজু- এক, ভৈরবগড়ের নৌকো আজ সন্ধ্যায় ছাড়বে। ছ'জন মাঝি, দুইজন দূত, আর একজন অতিথি।
রুদ্র- অতিথি কে?
ভজু- তপতী দিদিমণি। নামটা তিনি নিজেই লিখেছেন।
শর্মিষ্ঠা একবার ছেলের দিকে তাকালেন, তারপর ভজুকে। আর তার মুখে কোনো ভাবই এল না — এতটাই কিছু এল না যে ঘরের সবাই বুঝে গেল, এটা তিনি আগে থেকেই জানতেন।
শর্মিষ্ঠা- মেয়েটা বই পড়তে শিখেছে একটাই খাতা দিয়ে, আমার খাতা। আমাকে না জিজ্ঞেস করে সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই তার কাছে বাড়ির নিয়ম।
ভবানী- শর্মিষ্ঠা, সে তোর মেয়ে।
শর্মিষ্ঠা- জানে বলেই গেছে।
ভজু- আর দ্বিতীয় খবরটা।
রুদ্র- বল।
ভজু- মন্ত্রীর বাড়ি আজ সকালে খালি। সিন্দুক খোলা পড়ে আছে, ঘরে কেউ নেই, দরজায় তালা।
ভজু- আর আনন্দবাজার ঘাটের একজন মাঝি বলেছেন, কাল রাতে একটা ভাড়া করা নৌকো ভৈরবগড়ের দিকে গেছে।
ভজু- নৌকোয় ছিলেন দুজন লোক, আর একটা খাতা।
রুদ্রসেন উঠে দাঁড়ালেন, আর তার হাতটা সিলের কাপড়ের ওপর গিয়ে থামল।
রুদ্র- কে যাচ্ছে ভৈরবগড়?
ভজু- তপতী দিদিমণি।
রুদ্র- আর তার সঙ্গে?
ভজু- দূত, মাঝি, আর একটা খাতা।
রুদ্র- না। ভজু, খাতাটা কার?
ভজু- চন্দ্রলেখা রানির।
চন্দ্রলেখা কিন্তু সভার দরজায় দাঁড়িয়ে ইতিমধ্যেই পানের বাটাটা নামিয়ে রেখেছিলেন, আর তার মুখটা এমন কিছু বলে দিল, যেটা তিনি বলেননি — এই বাড়িতে চন্দ্রলেখা যদি একটা ছোট খাতা দেন, তাহলে সেটা রাখার জায়গা তিনি ঠিক করেই দেন।
তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, এমন শুকনো গলায় যে ঘরে কারও গা শীত হয়ে গেল।
চন্দ্রলেখা- খাতাটা আমার নয়। খাতাটা ওর।
চন্দ্রলেখা- আমি শুধু ওকে কাগজ দিয়েছি।
সভা ভাঙল না, কিন্তু কেউ আর কিছু বলল না। নিচে উঠোনে ঘাটের দিক থেকে একটা নৌকার পাল তোলার শব্দ ভেসে এলো, আর মেলার তাঁবুর শেষ খুঁটিটাও আজ সকালে উপড়ে গেছে।